বাংলাদেশে গত শনিবার থেকে কার্ফু জারির পর মঙ্গলবার টানা চতুর্থ দিনও সেটা অব্যাহত । সেই সঙ্গে হাসিনা সরকার সোমবারের পর এদিনও সাধারণ ছুটি বলে ঘোষণা করায়, সকাল থেকে রাজধানীর গলি থেকে রাজপথে মানুষ এবং যানবাহনের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে । সেই সঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং পুলিশের কড়া টহলদারি লক্ষ্য করা যায় । এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দেশজুড়ে গ্রেফতারের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ এবং র্যাব । তারা এটিকে ‘অশান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে’ অভিযান বলে বর্ণনা করছে । বাংলাদেশে কয়েকদিনের লাগাতার বিক্ষোভ আন্দোলনে সরকারি মতে সোমবার পর্যন্ত অন্তত ১৪১ জন নিহত হয়েছেন । বেসরকারি মতে সংখ্যাটা আরও বেশি ।
মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত নতুন মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি । টানা চারদিন ধরে বাংলাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে । পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, কেউ জানাতে পারছে না । রবিবার কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে আপিল বিভাগ । নিখোঁজদের ফিরিয়ে দেওয়া, হয়রানি বন্ধ, মন্ত্রীদের পদত্যাগ সহ কয়েক দফা দাবি জানিয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা । এই সমস্ত দাবিতে, হাসিনা সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে কর্মসূচী ঘোষণা করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দু’জন আহ্বায়ক । সোমবার রাতে ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের সামনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তারা এই দাবিগুলি তুলে ধরেন । বেঁধে দেয়া ওই সময়সীমার মধ্যে দাবি পূরণ না হলে, বুধবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত মুখে কালো পতাকা বেঁধে যে যার অবস্থানে থেকে সারাদেশে এই কর্মসূচী পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন দুই আহ্বায়ক । যে চারজন আহ্বায়কের নিখোঁজের কথা বলা হয়েছে, তাঁরা হলেন, আসিফ মাহমুদ, আব্দুল কাদের, রশিদুল ইসলাম রিফাত ও আবু বাকের মজুমদার ।
দেশের এই সাম্প্রতিক অস্থিরতার জন্য বিরোধীদের দায়ি করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেখ হাসিনা । তাঁর অভিযোগ, নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য এবং দেশকে চরম সংকটের ফেলে দিতেই পরিকল্পিত ভাবে বিরোধীরা এই আন্দোলনকে রূপ দিয়েছে । সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশে শান্তি বজায় রাখতে এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে, প্রয়োজনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে । পাশাপাশি, কার্ফু জারি করার জন্য দেশবাসীর যে হয়রানি ও ভোগান্তি হচ্ছে, তার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন সেখ হাসিনা । যদিও বাংলাদেশের অন্যতম বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, কার্ফু জারি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে, সরকার জনগণকে চরম বিপদ এবং দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে । সোমবার এক বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, কোটা বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি নেতাকর্মীদের কোনও ধরনের যোগ না থাকলেও, কাল্পনিক অভিযোগে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে ।
এমনকি রিমান্ডে নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের চরম ও কঠোর নির্যাতন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন আলমগীর । কোটা বিরোধী আন্দোলনে শুরু হওয়ার পর দলের কেন্দ্রীয় নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রুহুল কবির রিজভীসহ কয়েকশো নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে । বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলনরত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর দলীয় বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে, ছাত্রছাত্রীদের নৃশংস হত্যার পাশাপাশি, সরকার দেশ চালাতে ব্যর্থ হয়ে ফ্যাসিবাদী পথ অবলম্বন করে দেশকে ভয়াবহ অরাজকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে । বিবৃতিতে আলমগীর বলেন, সরকার মনে করছে এভাবে জনগণ ও বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক মনস্কা মানুষদের ওপর শক্ত মনোভাব দেখালে, তাদের অবৈধ ক্ষমতার বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দ করার সাহস পাবে না । এটা বর্তমান সরকারের ভ্রান্ত ধারনা । কারণ সরকারকে মনে রাখতে হবে যে অন্যায় অবিচার চালিয়ে জনগণের শক্তির কাছে কোনও স্বৈরাচার শাসক টিকে থাকতে পারেনি । বর্তমান সরকারও টিকে থাকতে পারবে না । সংঘাত, গ্রেফতার ও নির্যাতনের পথ পরিহার করে জনগণের দাবি মেনে নেওয়াই একমাত্র পথ বলে মনে করেন আলমগীর ।
বাংলাদেশে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অশান্তির পরিপ্রেক্ষিতে বহু নেপালি ছাত্র-ছাত্রী দেশে ফিরে গেছেন । কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এখন তাঁদের ভিড় বেশি । স্নাতকোত্র স্তরে পড়াশুনার জন্য বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার নেপালি ছাত্র-ছাত্রী আছেন নেপাল সরকার বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের দেশের নাগরিকদের জন্য একটি ভ্রমণ নির্দেশিকা জারি করেছে । যাতে তাদের জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে ।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বের নানা দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন । বিভিন্ন দেশের বড় বড় শহরে প্রতিবাদ-মিছিলের আয়োজন করা হচ্ছে । বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের গুলির প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় জনসভার আয়োজন করা হচ্ছে । সোমবার লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে বড় বিক্ষোভ হয় । যেখানে যোগদান করেন কয়েক হাজার বাংলাদেশি । পরে তাঁরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পার্লামেন্ট ভবন পর্যন্ত যান ।