ট্রাম্পের ওপর হামলা : মার্কিন রাজনীতিতে ‘আরও এক কালো অধ্যায়’
2 years ago 1 min read
নিউজটাইম ওয়েবডেস্ক :
দেবরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়
পেনসিলভেনিয়ায় নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় প্রাক্তন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলার খবরই এখন মার্কিন গণমাধ্যমগুলির সংবাদ শিরোনামে ।
এফবিআই ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে, গুলি চালানোর উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পকে ‘হত্যার চেষ্ট’ । আন্তর্জাতিক মহল এই হামলার তীব্র নিন্দা করেছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিজে শনিবারের ঘটনাকে বলেছেন, ‘মানসিক অসুস্থতা’ । এদিকে মার্কিন জনগন হামলার ঘটনায় স্তম্ভিত । তাঁদের মতে, ট্রাম্পকে হত্যার করার চেষ্টা, আমেরিকার জন্য এক ‘ভয়াবহ মুহূর্ত’ । প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মার্কিন গণতন্ত্রে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে । সেটাই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে শনিবারের ঘটনা । এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোট রাজনীতির পটভূমিতে ‘নতুন এক কালো অধ্যায়ের’ সূচনা হয়েছে বলেই অভিমত রাজনৈতিক মহলের ।
আমেরিকার স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা সেয়া ৬টার দিকে পেনসিলভেইনিয়ার বাটলারে নির্বাচনী প্রচারের সময় রিপাবলিকান প্রার্থী তথা প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর গুলি ছোড়েন এক হামলাকারী । ট্রাম্পের ডান কান ছুয়ে বেরিয়ে যায় গুলি । বরাত জোরে রক্ষা পান তিনি । নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়নের বাকী মাত্র আর কয়েকটা দিন । এরকম একটি সময়ে নির্বাচনি প্রচার সভায় প্রাক্তন এক প্রেসিডেন্টকে হত্যার চেষ্টা, গণতন্ত্র এবং প্রতিটি মার্কিন নাগরিককে তাঁদের নেতা বেছে নেওয়ার অধিকারের ওপর বড়সড় আঘাত হেনেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল । গুলিতে জনসভায় উপস্থিত ট্রাম্পের এক সমর্থকও মারা গিয়েছেন । আহত হয়েছেন আরও দু’জন । এই ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারকেই যেন তছনছ করে দিয়েছে । মার্কিন রাজনীতিতে সুরক্ষা ও নিরাপত্তার যে ধারণা গত কয়েক দশক ধরে তৈরি হয়েছে, এই ঘটনার পর সেটা যেন নাটকীয়ভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে ।
১৯৮১ সালে রোনাল্ড রেগান গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর, মার্কিন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আর কোনও প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্ট পদ প্রার্থীর ওপর এই ধরনের ঘটনা ঘটেনি । ট্রাম্পের ওপর শনিবারের হামলার ঘটনা, আবার যেন স্মরণ করিয়ে দিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশির দশকের সেই কালো অধ্যায় । যখন কেনেডি ভাতৃদ্বয়, যাঁদের একজন ছিলেন প্রেসিডেন্ট, আর অপরজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন । রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতায় প্রাণ হারিয়েছিলেন মার্টিন লুথার কিং-এর মতো বেশ কিছু জনপ্রিয় নেতাও ।
পেনসিলভেনিয়া কাণ্ডের মতো ষাটের দশকেও দেখা গিয়েছিল গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ । এরকম মেরুকরণ এবং ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের আবহেই দেখা যায় অসহিষ্ণুতা । আর যদি আগ্নেয়াস্ত্র কোনও ব্যক্তির ইচ্ছায় ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটা ইতিহাসের গতি প্রকৃতিও পাল্টে দিতে পারে । ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে প্রেসিডেন্ট না হলেও, তাঁর ওপর হামলার ঘটনা কিন্তু একটা ছবিই সামনে এনে দিয়েছে । সেটা হল, সবসময়ই এই পদটিকে কেন্দ্র করে একটা প্রছন্ন হুমকি আছে । বিশেষ করে তাঁদের জন্য, যাঁরা এই পদের দাবিদার । আমেরিকার মাটিতে আততায়ীর গুলিতে এর আগে নিহত হয়েছেন জন এফ কেনেডিসহ চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ।
এরপরের ৪০ বছরে অনেকেই মনে করেছিলেন যে আমেরিকার সিক্রেট সার্ভিস বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের গোপন হামলার ঘটনার পুনরুবৃত্তির সম্ভাবনা অনেকখানি কমিয়ে এনেছেন । কিন্তু বাস্তবটা হল, তখন থেকে এখনও পর্যন্ত আমেরিকায় রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা আসলে বন্ধই হয়নি ।
২০১১ সালে তৎকালীন অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্যাব্রিয়েলে গিফোর্ডস প্রকাশ্যে আক্রান্ত হন । গুলিতে তাঁর মস্তিষ্কে ব্যাপক ক্ষতি হয় । ওই হামলার ঘটনায় মৃত্যু হয় ছ’জনের ।
আবার ২০১৭ সালে রিপাবলিকান এক কংগ্রেস সদস্যর ওপর হামলা হয় । তখনকার হাউজ মেজোরিটি হুইপ এবং অন্য আরও তিনজনের ওপর গুলি চলেছিল । এরপর দেখা যায়, ২০২১ সালে ক্যাপিটল হিলে হিংসার ঘটনা ঘটে । অভিযোগ, সেটা ঘটিয়েছিলেন ট্রাম্পের সমর্থকরা । আমেরিকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়াতে । আর এবার হল খোদ ট্রাম্পের ওপর হামলা । এই ঘটনার পর নির্বাচনী প্রচার সভার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে । যদিও ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আদৌ ট্রাম্পের জনসভায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল ছিল না । কারণ তাঁদের ওই সভায় ঢোকার জন্য, অন্তত দু’ঘণ্টার তল্লাশি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল । সামান্য ব্যাগও সঙ্গে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল । তারপরও কীভাবে নিরাপত্তারক্ষীদের নজর এড়িয়ে, ট্রাম্পের কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন হামলাকারী ? উঠছে প্রশ্ন ।
শনিবারের ওই ঘটনার প্রভাব আমেরিকা এবং তার রাজনৈতিক গতি প্রকৃতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তার অনুমান করা কঠিন । হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে নতুন মোড় নিয়েছে মার্কিন রাজনীতিতে । দুই রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বিতর্কিত মন্তব্য করা বন্ধ করে, জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে । হামলার ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ডেলাওয়ারে ক্যামেরার সামনে হাজির হয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে বিবৃতি দিয়েছেন । তিনি বলেন, আমেরিকায় এই ধরনের অসহিষ্ণুতার কোনও স্থান নেই । পরে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট তথা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনেও কথা বলেন বাইডেন ।
ওহায়োর সেনেটর জেডি ভ্যান্স
কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশক ধরে দুই দলীয় রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, অসহিষ্ণুতার ঘটনাটি সেই ধারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে । কিছু রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ ট্রাম্পের ওপর হামলার জন্য খোদ বাইডেন ও তাঁর দলের ডেমোক্র্যাটদের দিকেই আঙুল তুলেছেন, যে ডেমোক্র্যাটরা একসময় প্রেসিডেন্ট পদে থাকাকালীন ট্রাম্পকে আমেরিকার গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে দাবি করেছিলেন । প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার তালিকায় থাকা ওহায়োর সেনেটর জেডি ভ্যান্সও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে, জো বাইডেনের দিকে অভিযোগের তির ছোঁড়েন । তিনি বলেন, ‘বাইডেনের প্রচার অভিযানের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিবাদী, যাঁকে যে কোনও মূল্যে থামাতে হবে, এই ধরনের কথাবার্তা বলা । যেটা হয়ত সরাসরি বর্তমান প্রেসিডেন্টকে ট্রাম্পের হত্যা প্রচেষ্টার দিকেই ইন্ধন যোগানোর ইঙ্গিত করে’ ।
প্রচার অভিযানের ব্যবস্থাপক ক্রিস লাসিভিটা
ট্রাম্পের প্রচার অভিযানের ব্যবস্থাপক ক্রিস লাসিভিটা বলেন, বামপন্থি কর্মী, ডেমোক্র্যাট ইনভেস্টার এবং বাইডেনকেও আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে ব্যালট বাক্সে জবাবদিহি করতে হবে, তাঁদের অযাচিত এবং বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য । বাইডেনের প্রচার শিবিরের বাড়াবাড়ির ফলেই হয়ত শনিবার পেনসিলভেনিয়ায় ট্রাম্পের ওপর হামলা হয়েছে বলে মনে করেন লাসিভিটা ।
ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্য গ্যাবি গিফোর্ড
সংবাদ সংস্থার দাবি, ডেমোক্র্যাটরা হয়ত এমন অভিযোগের সরাসরি অপত্তি জানাবেন । কিন্তু ২০১১ সালে অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্য গ্যাবি গিফোর্ডের ওপর গুলি চালানোর ঘটনার সময় তাঁরাও কিন্তু রিপাবলিকানদেরকে একই ভাষায় দায়ী করেছিলেন । পেনসিলভেনিয়ার অসহিষ্ণুতার ঘটনা নিঃসন্দেহেই সোমবার থেকে শুরু হওয়া রিপাবলিকান কনভেনশনে দীর্ঘ প্রভাব ফেলবে । নিরাপত্তা প্রোটোকল আরও জোরদার হবে । পাশাপাশি অপ্রীতিকর কোনওকিছু ঘটার নতুন এক পূর্বাভাসের ফলে, কনভেনশনস্থলের কাছে বিক্ষোভ-পাল্টা বিক্ষোভও দেখা যেতে পারে । ফলে আগামী দিনে এই দুই দলের লড়াইটা আরও কুৎসিত হয়ে উঠতে পারে, যা নির্বাচনি প্রচারণার ধরনই বদলে দিতে পারে, মত রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের ।
আগামী বৃহস্পতিবার রাতে রিপাবলিকান কনভেনশনে দলের মনোনীত প্রার্থী মঞ্চে উঠলে, তাঁর ওপর জ্বলজ্বল করবে স্পটলাইট । আর তখনই হামলা-পরবর্তী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুষ্টিবদ্ধ হাত ঊর্ধ্বে তুলে ধরার যেসব ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, সেগুলো মিলওয়াকি শহরের সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে, এ ব্যাপারে নিশ্চিত রাজনৈতিক মহল । মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে ‘লড়াই – লড়াই’ বলে ট্রাম্পের যে ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চেয়েছেন, তার সেইসব ছবি কেবল ইতিহাসই রচনা করেনি, বরং তা নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের হিসেব নিকেশ পাল্টে দিতে পারে ।
রিপাবলিকানরা যে থিম নিয়ে নির্বাচনি প্রচারের পরিকল্পনা করেছে, শনিবার ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনাটি তাতে নতুন শক্তি সঞ্চার করতে পারে । গুলি চালানোর ঘটনার পর ট্রাম্পের ছেলে এরিক নিজের বাবার একটি ছবি দিয়ে, এরই মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন ‘এই যোদ্ধাকেই আমেরিকানদের প্রয়োজন’ । পেনসিলভেনিয়ায় ট্রাম্পের সমাবেশের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবস্থার জন্য মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসকেও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মুখে পড়তে হবে । প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন এরই মধ্যে বলেছেন, তিনি পূর্ণ তদন্ত পরিচালনা করবেন । এ তদন্তে সময় লাগবে । তবে এত কিছুর মধ্যে এই মুহূর্তে একটি বিষয়ই পরিষ্কার – সেটা হল, নির্বাচনী জল গড়ানোর এই বছরে মার্কিন রাজনীতি নতুন এক চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে ।