কেবল মাত্র ২০২২ সালেই কানাডায় এক লক্ষ পাঁচ হাজারেরও বেশি গাড়ি চুরির ঘটনা ঘটেছে । অর্থাৎ প্রতি ৫ মিনিটে একটি করে গাড়ি গিয়েছে সেদেশে । কিন্তু কীভাবে কানাডা গাড়ি চুরির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক কেন্দ্র হয়ে উঠল ?
বছর দুয়েক আগের ঘটনা । কানাডার বাসিন্দা লোগান লাফার্নিয়া একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে গ্যারেজে তার পিকআপ ভ্যানটি আর নেই । তার ব্র্যান্ড নিউ র্যাম রেবেল গাড়িটি চুরি গিয়েছে । মাত্র দেড় বছর আগে ওই গাড়িটি কিনেছিলেন তিনি । ঘটনার পর অন্টারিও প্রদেশের মিল্টন শহরের বাসিন্দা লাফার্নিয়ার সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হওয়া ভিডিওতে দেখেন, গভীর রাতে বাড়ির সামনে রাখা পিকআপ ভ্যানে মুখোশ পরা দুই ব্যক্তি উঠছেন । তারপর তারা খুব সহজেই সেটি স্টার্ট করে, অবলিলায় চালিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে ।
কয়েক মাস পরে এই একই গাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন ঘুরছিল অনলাইনে । আটলান্টিক মহাসাগরের অপর পাড়ে প্রায় সাড়ে আট হাজার কিলোমিটার দূরে, ঘানায় গাড়িটি বিক্রি হবে । গাড়িটি যে তাঁরই, বিজ্ঞাপনে দেওয়া ছবি দেখে নিশ্চিত হন লাফার্নিয়ার । তিনি সংবাদ সংস্থাকে বলেন, গাড়টি যে তাঁর, সেটা বলে স্পষ্ট করেছিল একটি ল্যাপটপ হোল্ডার । যেটি তিনি তাঁর ছেলের জন্য চালক আসনের পেছনে লাগিয়েছিলেন । আর সেই হোল্ডারের মধ্যে তাঁর ছেলে আবর্জনা ফেলে রেখেছিল । লাফার্নিয়া সংবাদ সংস্থাকে আরও বলেন, তাঁর এক পরিচিত, যার বাড়ির রাস্তায় চোরের উৎপাত এত বেশি ছিল যে তিনি রাতের জন্য বাড়ির বাইরে একজন নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ করেছিলেন । কারণ তিনি কিছুতেই নিরাপদ বোধ করছিলেন না ।
কানাডায় গাড়ি চুরির বাড়বাড়ন্তকে ‘বিস্ময়কর’ বর্ণনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় তথ্য প্রদানকারী সংস্থার অধিকর্তা অ্যালেক্সিস পিকিউয়েরো বলেন, আমেরিকা এবং ব্রিটেনের তুলনায় অনেক কম জনসংখ্যার দেশে এরকম গাড়ি চুরির মত অপরাধের উচ্চ হার ‘বিস্ময়কর’ ব্যাপার । তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত একাধিক বন্দরনগরীও নেই কানাডাতে । তার পরেও এই ঘটনা, সত্যিই অবাক করার মত । কোভিড মহামারীর সময় থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ব্রিটেনে গাড়ি চুরির হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে ।
কানাডায় প্রতি এক লক্ষ্য মানুষের মধ্যে গড়ে ২৬২. ৫ টি গাড়ি চুরি হয়েছে । যেটা কিনা ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের তুলনায় অনেক বেশি । পরিসংখ্যান বলছে, ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে প্রতি এক লক্ষ মানুষের মধ্যে গড়ে ২২০টি গাড়ি চুরির ঘটনা ঘটেছে । কানাডায় গাড়ি চুরির হার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় কাছাকাছি । ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমেরিকায় প্রতি এক লক্ষ মানুষের মধ্যে গড়ে ৩০০টি গাড়ি চুরি যায় । সংবাদ সংস্থার দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাড়ি চুরির ঘটনা বৃদ্ধির জন্য মহামারী কোভিডকেই দায়ী করা হয়েছে । সেই সময় উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায়, নতুন কিংবা পুরনো, সব ধরনেরই গাড়িরই চাহিদা বেড়ে যায় ।
কানাডার অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের ডায়রেক্টর ইলিয়ট সিলভারস্টেইন বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে নির্দিষ্ট কোনও মডেলের গাড়ির জন্য একটি ক্রমবর্ধমান বাজার গড়ে উঠছে । যেখান থেকে চোরাই গাড়ির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আয়ের পথ খুলে দিয়েছে এই সংঘবদ্ধ অপরাধ । যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক । সিলভারস্টেইন আরও মনে করেন, কানাডার বন্দরগুলো যেভাবে পরিচালিত হয়, তাতে অন্যান্য দেশের তুলনায় সেখানে এ ধরনের চুরির ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে । তাঁর মতে, বন্দর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশ থেকে কি কি বের হচ্ছে, তার থেকে দেশে কী কী আমদানি করা হচ্ছে, সেদিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয় । একবার কোন গাড়ি শিপিং কনটেইনারে প্যাক হয়ে গেলে, সেটা ধরা কঠিন হয়ে পড়ে বলে মন্তব্য করেন সিলভারস্টেইন ।
চুরি হওয়া কয়েকটি গাড়ি উদ্ধারের কথা জানিয়েছে কানাডার পুলিশ । গত অক্টোবরে টরন্টো পুলিশ সার্ভিস জানিয়েছিল, ১১ মাসের তদন্তে ৬ কোটি কানাডিয়ান ডলার মূল্যের ১০৮০টি গাড়ি উদ্ধার হয়েছে । আর এই গাড়ি চুরির বিষয়ে নতুন করে ৫৫০টিরও বেশি অভিযোগ গঠন করা হয়েছে । তদন্তও চলছে । মন্ট্রিয়েল বন্দরে মাঝ ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ৪০০টি শিপিং কনটেইনারে তল্লাশি চালিয়ে চুরি যাওয়া প্রায় ৬০০টি গাড়ি উদ্ধার করেছে বন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা । বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্দর দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য যাওয়া-আসা করে, তাতে এই ধরনের অভিযান চালানো কঠিন । ২০২৩ সালে কেবল মাত্র মন্ট্রিয়েল বন্দর দিয়েই ১৭ কোটি কনটেইনার যাওয়া-আসা করেছে ।
সংবাদ সংস্থা লিখেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কনটেইনার তল্লাশির এক্তিয়ার বন্দর কর্মীদের থাকে না । পুলিস অফিসাররা কেবল কাস্টমস নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলিতেই ওয়ারেন্ট ছাড়া কনটেইনার খুলে দেখতে পারেন । অন্যদিকে একটা অভিযোগ উঠছে যে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ও কর্মী সংখ্যা না থাকলেও, কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে কানাডা বর্ডার সার্ভিস এজেন্সি বা সিবিএসএ । গত এপ্রিল মাসে সরকারের কাছে দেওয়া প্রতিবেদনে এই সংস্থাটি তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছে । এছাড়া চোরাচালান আটকাতে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সংস্থাটির মেয়াদোত্তীর্ণ প্রযুক্তিও ।
কানাডার যেসব স্থানে গাড়ি চুরির ঘটনা সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে একটি হল অন্টারিও নগরীর ব্রাম্পটন এলাকা । সেখানকার মেয়র প্যাট্রিক ব্রাউন সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির পোর্ট নেওয়ার্ক কনটেইনার টার্মিনাল পরিদর্শন করেছেন । আমেরিকা ও কানাডার তল্লাশি প্রক্রিয়ার পার্থক্য কী, সেটা তিনি সরেজমিনে দেখেন । এরপর তিনি কানাডার সংবাদপত্র ন্যাশনাল পোস্টকে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর কর্তৃপক্ষ ‘স্ক্যানার’ পেয়েছে । তারা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করতে পারে । তারা স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে । তাই তাদের নজরদারি আরও তীক্ষ্ণ । কিন্তু কানাডায় এই কাজগুলো করা সব সময় সম্ভব হয় না বলে মন্তব্য করেন মেয়র ।
কানাডা সরকার গত মে মাসে ঘোষণা করেন, সিবিএস-এর শিপিং কনটেইনার তল্লাশির সক্ষমতা বাড়াতে, তারা কয়েক মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার মঞ্জুর করবে । নিজেদের কমিউনিটির মধ্যে গাড়ি চুরি ঠেকাতে, এলাকাভিত্তিক পুলিশকেও অতিরিক্ত অর্থ সাহায্য করা হবে । অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের ডিরেক্টর সিলভারস্টেইন মনে করেন, কানাডায় গাড়ি চুরি যাওয়া নিয়ে যে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার জন্য উৎপাদকরাও কম দায়ী নায় । ‘সবাই গাড়ি উদ্ধারের চেষ্টার কথা বলছে । কিন্তু আমার বুঝতে পারছি না যে, চুরি ঠেকাতে, গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি কী করছে ? তারা সেভাবে তৈরি তৈরি করছে না কেন ?’
এদিকে লোগান লাফার্নিয়ারের মতো আরও যাঁদের গাড়ি চুরি গিয়েছে, তাঁদের ভাবতে হচ্ছে, আগামী দিনে গাড়ি কিনে, কীভাবে সেগুলি তাঁরা নিরাপদে রাখবেন । অনেকেই সেই আতঙ্কে আর গাড়ি কিনছেন না । তবে লোগান কিনেছেন । র্যাম রেবেল পিকআপ ভ্যানটি চুরি হওয়ার পর, তিনি কিনেছেন টয়োটা টুন্ড্রা, যাকে ‘স্বপ্নের গাড়ি’ বলে বর্ণনা করেছেন লাফার্নিয়ার। চোর যাতে সহজে গাড়ি স্টার্ট দিতে না পারে, তার জন্য তিনি ইঞ্জিন ইমোবিলাইজার লাগিয়েছে । চুরি হলে যাতে গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করতে পারেন, সেজন্য ট্যাগ ট্র্যাকারও লাগিয়েছেন । স্টিয়ারিং হুইলের জন্য ক্লাব বা বিশেষ তালারও ব্যবস্থা করেছেন । তবু চোরদের তৎপরতা কিন্তু থামেনি । লাফার্নিয়ারের টুন্ড্রা গাড়ি চুরি করতে পার্কিং এলাকায় এসেছিল দু’জন । তবে এবার অবশ্য চোররা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে যায় । ভেতরে ঢোকার জন্য, গাড়ির পেছনের জানালার কাঁচ ভাঙতে হয়েছিল দুষ্কৃতীদের । সেই শব্দে ঘুম ভেঙে যায় লাফার্নিয়ারের । তিনি জরুরি সেবা ৯১১-এ ফোন করেন । খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যেতে পুলিসের মিনিট চারেক সংয় লাগে । ততক্ষণে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা । এরপর সেই গাড়িতে নতুন কাচ লাগিয়ে, সেটি বিক্রি করে দিয়েছেন লাফার্নিয়ার । তারপর আর কোনও গাড়ি কেনেননি কানাডার এই নাগরিক । কারণ গাড়ির নিরাপত্তার প্রশ্নে এইসব অনাকাঙ্ক্ষিত পরীক্ষা কেবল ‘হতাশায়’ ডুবিয়েছে তাঁকে ।