কেন বাড়ছে ‘ডিজিট্যাল ডিমেনশিয়া’ ?

নিউজটাইম ওয়েবডেস্ক : দেবরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়

যত দিন যাচ্ছে, প্রযুক্তির হাত ধরে মানুষের জীবন আরও আধুনিক, আরও উন্নত হচ্ছে । কিন্তু সব কিছুই কী মানুষের উপকারে লাগছে ? না । কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নততর প্রযুক্তির ক্ষতিকারক প্রভাবও পড়ছে আমাদের জীবনে । দেখা যাচ্ছে – ফোন, টিভি কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনে বেশি সময় ব্যয় করলে, হতে পারে ‘ভুলে যাওয়ার রোগ’ । যাকে বলা হচ্ছে ডিজিট্যাল ডিমেনশিয়া

চিন্তা ও স্মরণশক্তি, কথা বলা, বিচারবুদ্ধি এবং জীবনের সার্বিক মানের ওপর যখন নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তাকে বলে ‘ডিমেনশিয়া’ বা চিত্তভ্রংশ । বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মানুষের যে ক্ষতি হয়, সেটাই হল ‘ডিজিট্যাল ডিমেনশিয়া’ ।

‘ডিজিট্যাল ডিমেনশিয়া’ আসলে কি ?
জার্মানির স্নায়ু ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর ম্যানফ্রেড স্পিৎজার ২০১২ সালে প্রথম ‘ডিজিট্যাল ডিমেনশিয়া’-র ধারনা, সবার সমক্ষে পেশ করেন । তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলাফল হল মানুষের জ্ঞানীয় ক্ষমতায় পরিবর্তন’ ।
শারীরিক সমস্যা হিসেবে এই রোগ চিহ্নিত করা না হলেও, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ‘স্ক্রিন টাইম’ বা বৈদ্যুতিক পর্দার দিকে তাকিয়ে অতিরিক্ত সময় কাটিয়ে দিলে, সেটা মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় ক্ষমতায় পরিবর্তন আনে ।

২০২২ সালে প্রকাশিত লস অ্যাঞ্জেলসের ‘ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া’-র একটি গবেষণায় দেখা যায়, অলস স্বভাবের সঙ্গে যদি টিভি দেখা ও কম্পিউটার ব্যবহার যুক্ত হয়, তাহলে স্মৃতিভ্রংশ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় । গবেষণায় আরও বলে হয়েছে, ‘কগনিটিভলি প্যাসিভ’ বা জ্ঞানীয় ক্ষমতার নিষ্ক্রিয় আচরণ, যেমন – টিভি দেখা ‘ডিমেনশিয়া’ সহ শারীরিক কাজকর্মের ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় । গবেষকদের দাবি যে ‘কগনিটিভলি অ্যাক্টিভ প্যাসিভ’ বা নিষ্ক্রিয় জ্ঞানীয় ক্ষমতার সক্রিয় ব্যবহার, যেমন – কম্পিউটারে কাজ করা, সেটা কিন্তু স্মৃতিভ্রংশ হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয় ।

২০২৩ সালে দিল্লির ‘ইন্সটিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস অ্যান্ড রিসার্চ’-এর একটি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত ‘স্ক্রিন টাইম’-এর কারণে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্মরণশক্তির ওপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে । এছাড়া চিনের ‘দি ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হসপিটাল অফ জিউনান ইউনিভার্সিটি’ প্রায় ৪ লক্ষ ৬২ হাজার মানুষের উপর ‘স্ক্রিন টাইম’ ও অলস ব্যবহার বিষয়ক একটি সমীক্ষা চালায় । সেখানে কম্পিউটর ও টেলিভিশন দেখা – দু’টি বিষয়ের উপরই গবেষণা হয় । সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যাঁরা দৈনিক চার ঘণ্টা বা তার বেশি সময় বেশি বৈদ্যুতিক পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাঁরা ‘ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া’, ‘অ্যালজাইমার্স রোগ’ এবং ‘অল কজ ডিমেনশিয়া’ মত রোগের শিকার হচ্ছেন । পাশাপাশি অতিরিক্ত ‘স্ক্রিন টাইম’, মস্তিষ্কের সরাসরি ক্ষতিও করে ।

ডিজিট্যাল ডিমেনশিয়া’র লক্ষণ গুলি কী কী ?
এই ধরনের সমস্যা কোনও মেডিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে না । তাই সমস্যা নির্ণয় করা খুবই কঠিন । তবে কিছু লক্ষণের মাধ্যমে ডিজিটাল স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ পায় । সেগুলি হল –
সাময়িক স্মৃতিলোপ
সহজেই ভুলে যাওয়া বা কোনো কিছু হারিয়ে ফেলা
কোনও শব্দ মনে করতে কষ্ট হওয়া
একসঙ্গে কয়েকটি কাজ বা ‘মাল্টিটাস্কিং’ করতে সমস্যা হওয়া

এছাড়া মনোযোগের অভাব, কথাবার্তা ও যোগাযোগ ক্ষমতায় সমস্যা সহ মানুষের চরিত্রে নানান ধরনের প্রভাব দেখা দিতে পারে । এছাড়া অতিরিক্ত সময় কোনও ইলেকট্রনিক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে, রাতে ঘুমের সমস্যা হয় এবং মেজাজও ঠিক থাকে না । আর এগুলিই পরবর্তীকালে মস্তিষ্কের কাজকর্মে প্রভাব ফেলে ।

বাঁচার উপায় কী ?
ডিজিট্যাল ডিমেনশিয়া’ সারানোর সেই অর্থে কোন ওষুধ নেই । তাই মনে রাখতে হবে যে প্রযুক্তির ব্যবহার কমানোই হবে আসল দাওয়াই । এক্ষেত্রে আমাদের আরও কিছু পদক্ষেপে অনুসরণ করা দরকার ।

  • নোটিফিকেশন মাত্রা কমানো : ফোনের দিকে বারবার মনোযোগ চলে যাওয়া আটকানোর একটি উপায় হল, নোটিফিকেশনের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া । যেগুলির কোনও প্রয়োজন নেই কিংবা অপেক্ষাকৃত কম দরকারি, সেগুলির নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা ।
  • নিস্ক্রিয় মিডিয়ার সময় কমানো : যে কোনও ব্যক্তির কাজের মাত্রার ওপর এই বিষয়টা নির্ভর করে । তবে কাজ ছাড়া বিনা কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটানোর সেই সময়টা কিন্তু কমাতে হবে ।
  • মনোযোগের অন্য বিষয় খোঁজা : একঘেঁয়ে সময় কাটাতে ফোন কিংবা টিভি দেখার লোভ সামলাতেই হবে । আপনি চিন্তা করে দেখুন যে শেষ কবে বই পড়েছিলেন বা বাইরে হাঁটতে গিয়েছিলেন । এই ধরনের টুকরো টুকরো কিছু বিষয়ের দিকে নজর দিলে, মোবাইল কিংবা টিভির দিকে হয়ত নজর কম যাবে ।
  • সময় নির্দিষ্ট করা : ‘স্ক্রিন টাইম’ কমানোর মানে এই নয় যে সব কিছু বন্ধ করে দিতে হবে । তবে সবকিছুর জন্য সময় নির্দিষ্ট করে রাখা দরকার । অবসর সময়ে কিছুক্ষণ মোবাইল ফোন দেখা, গেইম খেলা কিংবা টিভি দেখায় অভ্যাস করতে হবে । তবেই চোখও ভাল থাকবে ।
মোট কথা হল, কোনও ভাবেই অতিরিক্ত সময় বৈদ্যুতিক পর্দার দিকে কাটানো যাবে না ।

নিউজ টাইম চ্যানেলের খবরটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
Inform others ?
Share On Youtube
Show Buttons
Share On Youtube
Hide Buttons
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
Facebook
YouTube