নিউজটাইম ওয়েবডেস্ক : দেবরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়
আজ ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচন । নিজেদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগের আগে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী এজেন্ডার দিকে তাকাচ্ছেন ভোটাররা । দলের প্রতিশ্রুতি আর জাতীয় স্বার্থকে মিলিয়ে নিচ্ছেন তাঁরা । যার প্রতিফলন ঘটবে আজ ভোটবাক্সে ।
আজকের নির্বাচনী ময়দানে রয়েছেন ৯৫টি দলের চার হাজারের বেশি প্রার্থী । এর মধ্যে ১১ জন নির্দল সহ রয়েছেন মোট ৩৪ জন এশিয় বংশোদ্ভূত প্রার্থী । ভোটের আগের জনমত সমীক্ষাগুলি ইঙ্গিত দিয়েছে, এবার প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক আর বর্তমান বিদেশমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সহ পাঁচ নেতার নেতৃত্বে, টানা ১ দশকেরও বেশি সময় কনজারভেটিভদের শাসনের পর, এবারের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চলেছে প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি । যেসব দল ভোটের মহারণে উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজের নিজের নির্বাচনি ইশতেহার । যেখানে রয়েছে ‘প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি’ । তবে বিভিন্ন দাবিতে ভোটারদের মধ্যে ‘বিভাজন’ এবং অন্য দলের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার একটি ট্রেন্ড এবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে । ব্রিটেনের জাতীয় এবং আন্তজার্তিক বিভিন্ন বিষয়, ভোটের ময়দানে বেশ প্রভাব ফেলছে । বিভিন্ন দলের ইশতেহারের দিকেও নজর রাখছেন ভোটাররা । দলের প্রতিশ্রুতি এবং তার সঙ্গে দেশের স্বার্থকে মিলিয়ে নিচ্ছেন তাঁরা । যার ব্যালটে প্রতিফলন ঘটবে আজ । শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় যারাই আসুক না কেন, ভোটারদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠা সাতটি চ্যালেঞ্জ নিয়েই তাদের আগামী দিনে এগোতে হবে । ভোটের আগে, লন্ডনের জনপ্রিয় সমীক্ষা সংস্থা ‘ইউগভ’ ব্রিটেনের ভোটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে একটি সাপ্তাহিক সমীক্ষা চালিয়েছে । সেখানে দেখা গেছে, দেশের ৫২ % ভোটার অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন । এরপর স্বাস্থ্যে ৫০% মানুষের নজর ছিল অভিবাসন নীতির ওপর । পাশাপাশি আশ্রয় বা বাসস্থানের দিকে নজর ছিল ৪০% ভোটারের । ৫ % , শিক্ষায় ১৪ % , ব্রেক্সিটে ১৩ % এবং আয়কর পরিকাঠামোর দিকে ১৩ % ভোটার গুরুত্ব দিয়েছেন ।

- অর্থনীতি
বিগত কয়েক বছরে দেশে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি এবং সেই অনুপাতে বেতন না বাড়ায় ব্রিটেনের জনগণ তাদের জীবনযাত্রার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন । অর্থনীতিকে ঠিকঠাক করতে তাই ভিন্ন ভিন্ন উপায় বাতলে দিয়ে, ভোটের প্রচারে সরব হয়েছিল যুযুধান দুই দল কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টি ।
সংবাদ সংস্থার দাবি, লেবার নেতা কিয়ার স্টারমার লেবার পার্টির ইশতেহারে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস), আবাসন, জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দলের রূপরেখা ঘোষণা করেছেন । এইসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য তাঁর দল ৭৪০ কোটি পাউন্ড কর বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন । অন্যদিকে নাগরিকদের বেতনের ওপর বাধ্যতামূলক ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্সের করের হার ২ শতাংশ পয়েন্ট কমানো সহ, বছরে ১ হাজার ৭০০ কোটি পাউন্ড কর কমানোর পাল্টা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি ।

- আবাসন সমস্যা
২০১০ সালে কনজারভেটিভ ও লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টি জোট করে ক্ষমতা দখল করেছিল । তখন সরকারের বাজেট ঘাটতি কমিয়ে, নাগরিকদের ওপর চাপ কমানোর একটা চেষ্টা করা হয়েছিল । তার জন্য সেই সময় সরকার যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার চাপ তীব্র হয় স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর উপর ।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগের অধ্যাপক মিয়া গ্রে বলেন, ‘মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে আবাসনের সংকট রয়েছে ব্রিটেনে । এর কারণগুলিও খুব জটিল । কিন্তু স্থানীয় সরকারের বাজেটে, বিশেষ করে কঠিন পদক্ষেপের কারণে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে’ । আবাসন ক্ষেত্রে সংকটের এই পরিস্থিতিতে ফের কনজারভেটিভরা নির্বাচনে জয় পেলে, এবার ১৬ লক্ষ নতুন গৃহ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । অবশ্য লেবার পার্টির নেতারা বলছেন, আবাসনে সমস্যার মধ্যে ২০২৩ সালে বাড়ি নির্মাণের যেসব কর্মযজ্ঞ বাতিল হয়েছিল, এবারের নির্বাচনে তারা জিতে সরকার গঠন করলে, সেই কাজগুলো ফের চালু হবে । আগামী বছরগুলোতে ১৫ লক্ষ ঘরবাড়ি নির্মাণের লক্ষ্য রয়েছে তাদের । দাবি লেবার পার্টির ।

- স্বাস্থ্য পরিষেবা
দুর্ঘটনা ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের দেখা পেতে চার ঘণ্টার বেশি সময় ধরে হাসপাতালে অপেক্ষা করা মানুষের সংখ্যা, ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির ১৪ বছরে শাসনকালে ক্রমশ বেড়েছে । এটি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখছেন ব্রিটেনের মানুষ । প্রসঙ্গত, চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যা ২০১১ সালে ছিল ৬ % । সেটাই ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ % । তবে এখন সেটা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৪২ % ।
ভোট প্রচারে কনজারভেটিভ পার্টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে – পুনরায় জয়ী হলে তারা এনএইচএসের জন্য বাজেট বাড়াবে । কিন্তু অন্য দলগুলি এই ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিতে তেমন জোর দেয়নি । লেবার পার্টিও এনএইচএসে রোগীদের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনার ঘোষণা করেছে । তবে ভিন্ন উপায়ে । এনএইচএসে সপ্তাহে ৪০ হাজার অতিরিক্ত রোগীর চিকিৎসার বিনিময়ে তাদের অপেক্ষার পালা কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে লেবার পার্টি । এ ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে ক্যান্সার স্ক্যানারের সংখ্যা বাড়িয়ে, ক্যান্সার রোগীদের অপেক্ষার সময় কামানোর ঘোষণা করেছে স্টারমারের দল ।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গত মার্চ মাসের তথ্য বলছে, ক্যান্সার চিকিৎসায় সরকার নির্ধারিত ৬২ দিনের যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল, সেটিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূরণ হচ্ছে না । ভোটের আগে স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক সংখ্যা ও চিকিৎসা কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে লিবারেল ডেমোক্র্যাটসরা । অপরদিকে এনএইচএস ও সামাজিক পরিষেবা প্রদানের সামনের সারিতে থাকা কর্মীদের কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রিফর্ম পার্টি । বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা করমুক্ত করার কথাও ঘোষণা করেছে তারা ।
- অনুপ্রবেশ

সংবাদ সংস্থার দাবি, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে গত ১৯ জুন ব্রিটেনে ঢুকেছিল ৮৮২ জন । এই সংখ্যাটা ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দৈনিক অনুপ্রবেশ । অবৈধ বা কাগজপত্রহীন অভিবাসন প্রত্যাশীদের ব্রিটেন থেকে রুয়ান্ডায় পাঠানোর একটি ‘বিতর্কিত’ পরিকল্পনা নিয়েছে ঋষি সুনাকের সরকার । অথচ বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগ, এর আগে আদালত বেশ কয়েকবার আটকে দিয়ে বলেছিল, এটা অনৈতিক, এটা অমানবিক । ২০২২ সালের ১৪ এপ্রিল ব্রিটেন রুয়ান্ডা সরকারের সঙ্গে ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’ (এমইডিপি) নামে একটি চুক্তির পরিকল্পনা নিয়েছিল । পরে এর চুক্তির নাম হয় ‘ইউকে-রুয়ান্ডা অ্যাসাইলাম পার্টনারশিপ’ ।
সুনাক সরকারের পরিকল্পনায় ব্রিটেনে এসে আশ্রয় চাওয়া বিদেশিদের প্রথমে রুয়ান্ডায় পাঠানো হবে, সেখান থেকে তারা আশ্রয় বা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন । যাচাই-বাছাই করে যারা আশ্রয়ের যোগ্য, তাঁদের ব্রিটেনে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে । বাকিদের রুয়ান্ডা থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে । তবে এই পরিকল্পনা ঘোষণার দুই বছর পরেও, এখন পর্যন্ত রুয়ান্ডায় কোনো ফ্লাইট যায়নি ।
প্রধানমন্ত্রী সুনাকের ঘোষণা অনুযায়ী, শরণার্থীদের নিয়ে প্রথম ফ্লাইটটি রুয়ান্ডায় যাওয়ার কথা ২৪ জুলাই । তবে তার আগেই ভোট হচ্ছে ব্রিটেনে । টোরিরা (কনজারভেটিভ পার্টি) পরাজিত হলে, এই পরিকল্পনা আর কার্যকর হবে না বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল । কারণ এরই মধ্যে লেবার পার্টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে রুয়ান্ডা পরিকল্পনা বাতিল করবে । অবশ্য লেবার পার্টিও ব্রিটেনে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা কমানোর ওপর জোর দিয়েছে । তারা বলছে, কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের বিমানবন্দর থেকেই তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে । তবে পরিকল্পনাটি ঠিক কী, সেটা এখনও স্পষ্ট নয় বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ।
- ইউক্রেইন প্রসঙ্গ

- গাজা সংকট

- ‘ডিভলভড’ ও ‘রিজার্ভড’ ইস্যু

ডিভলভড ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, বিচার ও পুলিশিং, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ । এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার । অপরদিকে রিজার্ভড ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা, বৈদেশিক বিষয়, অভিবাসন, বাণিজ্য ও মুদ্রা। এসব বিষয় কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের অধীনে নির্ধারিত হয় এবং সে অনুযায়ী সরকার চলে ।
ব্রিটিশ পার্লামেন্ট রাজ্যগুলোর জন্য ডিভলভড ইস্যুগুলোতে নীতি সহায়তা ও বরাদ্দ দিয়ে থাকে । আর রিজার্ভড বিষয়গুলোও এবার স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দান আয়ারল্যান্ডে মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে । বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে ঘিরে ।
Latest posts by news_time (see all)
- সন্দেশখালি দুর্ঘটনায় মামলা দায়ের ন্যাজাট থানায়, অভিযুক্ত ৮ - December 11, 2025
- ইন্ডিগোর সমস্যা নিয়ে সরব মুখ্যমন্ত্রী, কংগ্রেস - December 8, 2025
- সংসদে কংগ্রেসকে নিশানা নরেন্দ্র মোদীর - December 8, 2025

