ব্রিটেনে নির্বাচন : হার-জিতের ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ মানে কী?
2 years ago 1 min read
নিউজটাইম ওয়েবডেস্ক :
দেবরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্লামেন্টে নতুন জনপ্রতিনিধি বেছে নিতে ব্রিটিশ জনতা ভোট দেবেন বৃহস্পতিবার । সেদেশের নিয়ম অনুযায়ী, যে প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন, তিনিই হবেন তাঁর আসনের আইন প্রণয়নকারী ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পদ্ধতি একেক রকমের । ব্রিটেনে নির্বাচন হয় ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে । কিন্তু কী এই পদ্ধতি ? সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, এই পদ্ধতিতে প্রত্যেক আসনে সর্বোচ্চ ভোট যিনি পাবেন, তিনিই হবেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য বা এমপি । ভোটে দ্বিতীয় স্থানে থাকা দল বা প্রার্থীর জন্য কিছুই নেই । মানে তাঁরা ওই আসনে পরাজিত । ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড জুড়ে থাকা ৬৫০টি নির্বাচনি আসনে এই পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ হয় । ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের একাংশ মনে করেন, হাউস অব কমন্স গঠনে এই প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ ভোটের প্রতিফলন হয় না । তবে এর পক্ষে যাঁরা কথা বলেন, তাদের যুক্তি, ‘স্থিতিশীল সরকার’ গঠনের ক্ষেত্রে ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ প্রক্রিয়াটি খুবই কার্যকর ।
‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ আসলে কী?
ব্রিটেনের ৬৫০টি সাংবিধানিক আসনের প্রত্যেকটিতে একজন করে এমপি বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন । যিনি তার এলাকার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন ওয়েস্টমিনস্টারে । ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে ‘ক্রস চিহ্ন’ এঁকে দেন ব্যালট পেপার । যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই জয়ী ঘোষিত হন । জয় পেতে প্রদত্ত ভোটের ‘নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ অর্জনের দরকার নেই । অন্য প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থীকেই এখানে জয়ী ঘোষণা করা হয় । এই পদ্ধতিকেই বলা হয়ে থাকে ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ । নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীর বিশেষত্ব কিছু নেই । তিনি এক ভোটে হারলেও তাকে পরাজিত বলেই ধরা হয় ।
একইভাবে যে দলের সবচেয়ে বেশি প্রার্থী জয় পান, সে দলকেই নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় । অর্থাৎ যে দলের এমপি সংখ্যা বেশি, হাউজ অব কমন্সে তারাই সরকার গঠন করে । ভারত, বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পার্লামেন্ট নির্বাচন ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতিতেই হয় । এখানেই শেষ নয় । ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতিতে জয়-পরাজয় নির্ধারণের পর, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটাও কিন্তু ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতিতে ঠিক করা হয় । এ ক্ষেত্রেও ব্রিটেনে রয়েছে নিজস্ব আইন ।
বিজয়ী দলের প্রধানই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পার্লামেন্ট নেতা অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী হন । যদিও বিশ্বের অনেক দেশের নির্বাচনে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও, দলীয় প্রধানই যে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তেমনটা হয় না । আমাদের দেশেও দলীয় প্রধানকেই যে প্রধানমন্ত্রী হতে হবে, এমন নিয়ম নেই । পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগে বা পরে দল মনোনীত যে কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন । দলের প্রধান হওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটেনে দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় । প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক – সকলেই দলীয় প্রধান হওয়ার প্রতিযোগিতায় জিতে, তবেই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন । ব্রিটেনে এরকম ব্যবস্থা সব দলের জন্যই প্রযোজ্য ।
ব্রিটেনে ২০১৯ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি ৩৬৫ আসন পেলে প্রধানমন্ত্রী হন বরিস জনসন । তার আগে ২০১০ সালের নির্বাচনে কোন দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি । সেসময় বেশি আসন পাওয়া কনজারভেটিভ পার্টি সরকার গঠনে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে জোট করে ।
ব্রিটেনে বড় দু’টি দল হল কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টি । দু’টি দলই ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দেয় । তারা মনে করে, এই পদ্ধতি সহজ এবং ভোটাররাও সহজে বুঝতে পারেন । শুধু তাই নয়, এই পদ্ধতির সাহায্যে ভোটার ও এমপির মধ্যে যোগসূত্র বা সম্পর্কও গড়ে তোলা যায় । সংবাদ সংস্থার দাবি, ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতিতে ভোটাররা দলের চেয়ে প্রার্থীকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ পান । পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে তাঁরা অবারিত সুযোগ পান । তবে যদি সেই এমপির কাজ পছন্দ না হয়, তাহলে পরের নির্বাচনে ব্যালটে তার জবাব দিয়ে দেন ব্রিটেনের ভোটাররা ।
যেহেতু ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে যে কোন একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠনের সুযোগ পায়, তাদের সমর্থকরাও বলে থাকেন, এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দলেরও ‘নীতি-কর্মসূচি’ কার্যকর করার সুযোগ অনেক বেশি থাকে । তবে অন্যদের যুক্তি হল, যেহেতু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ থাকে, সেক্ষেত্রে বিভিন্ন দলের মধ্যে এই ইস্যুতে মতানৈক্যের জন্য অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলে । জোট গঠনে দলগুলোর এই গোপন আলাপ হয়ে থাকে ভোটারদের চোখের আড়ালে, একেবারে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে । সংবাদ সংস্থা আরও জানিয়েছে, ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতি নিয়ে ব্রিটিশ ভোটারদের মধ্যে বিভাজন বহু দিনের । ২০১১ সালে ব্রিটেনে এই পদ্ধতি রাখা না রাখা নিয়ে গণভোট হয় । সেখানে কিন্তু ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতি রাখার পক্ষে ভোট দেন ৬৭.৯ % মানুষ । আর বাতিলের পক্ষে ভোট দেন ৩২.১ % মানুষ ।
‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ : পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি
সংবাদ সংস্থা লিখছে, বর্তমান পদ্ধতিতে বেশিরভাগ এমপি তার এলাকায় অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন । এ ক্ষেত্রে দু’টি বিষয় দেখা যায়, ভোটার বেশি হলেও ভোট কেন্দ্রে যান অল্প মানুষ । আর তাঁরা তাঁদের পছন্দের প্রার্থীদের যে যার মত করে ভোট দেওয়ায়, মোট প্রদত্ত ভোট সব প্রার্থীর মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায় । ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ এর বিপক্ষে যারা যুক্তি দেন, তাদের মত হল, এই পদ্ধতি জনগণের ভোট দেওয়ার প্রবণতা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে । কারণ তাঁরা মনে করেন, তাঁদের ভোট শুধু শুধু নষ্ট হবে । যেমন – ভোটাররা মনে করতেই পারেন, তাঁদের কনজারভেটিভ প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কোন মানে নেই । কারণ, বর্তমান লেবার প্রার্থী যিনি আছেন, আগের নির্বাচনে তার বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে । যা নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তনের তেমন সম্ভাবনা নেই । ফলে কোনও ভোটার তখন ইচ্ছে করলেই নিজের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ নাও করতে পারেন । ফলে নিজেদের পছন্দের হলেও ‘সম্ভাব্য পরাজিত’ প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে, ভোটাররা ভিন্ন কৌশল নিতে পারেন । একইভাবে দেশের অনেক বেশি মানুষ তাদের পছন্দের দলীয় প্রার্থীকে ভোট দিলেও পার্লামেন্টে যে দলের এমপি বেশি হয়, তারাই সরকার গঠন করে থাকে ।
এর আগে ২০১৯ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি ‘পপুলার ভোটে’ ৪৪%-রও কম পেলেও পার্লামেন্টে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছিল । প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৫ সাল থেকে ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচনে কোনও দলই ৫০ শতাংশের বেশি ভোটে জেতেনি । তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কনজারভেটিভ বা লেবারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপিরা সরকার গঠন করেছেন ।
ছোট দলগুলোর কাছে ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ মানে কী? ব্রিটেনে অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে তাদের কোন সুবিধা হচ্ছে না । ভোটের এই প্রক্রিয়ায় বহুদলীয় গণতন্ত্র ঠিকমত প্রতিফলিত হচ্ছে না । যেমন – ২০১৯ সালে লিবারেল ডেমোক্র্যাটস-রা ১১.৫ % ভোট পেলেও, হাউস অব কমন্সে ২ %-রও কম আসন পায় । ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে গ্রিন পার্টি ২ .৭ % ভোট পেলেও, দলটির এমপি হন মাত্র একজন । ২০১৫ সালে ইউকে আইপি ১২ .৬ % ভোট পেলেও, তাদের এমপি ছিল মাত্র একজন ।
‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ ছাড়া আর কী ? ব্রিটিশ পার্লামেন্টে হলেও, স্কটিশ ও ওয়েলশ পার্লামেন্ট বা নর্দান আয়ারল্যান্ডের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে হয় না । পরিবর্তে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ (পিআর) পদ্ধতিতে সেখানে ভোট হয় । প্রসঙ্গত, রাজ্যভিত্তিক পরিষদকে ব্রিটেনে জাতীয় পরিষদ বলা হয় ।
পিআর পদ্ধতিতেও রকমফের থাকতে পারে । অনেক সময় প্রার্থীর অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে ভোটার র্যাঙ্কিং দেখা হয় । অথবা ব্যক্তির পরিবর্তে দলীয় নির্বাচনকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় । এসব প্রক্রিয়ার সমর্থক যেমন আছে, তেমনি সমালোচকও আছেন । তবে সবারই লক্ষ্য একটাই । ভোট পড়ার ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে জাতীয় পরিষদ বা পার্লামেন্টে আসন বণ্টন । মোট কথা, নির্বাচনে অংশ নেওয়া কোনো দল যদি ৩০ % ভোট পায়, তাহলে তারা মোট আসনেরও ৩০% পাবে । পিআর পদ্ধতিতে পার্লামেন্টে এক দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব বেশি দেখা যায় না । কারণ, নির্বাচনের প্রবণতাই থাকে ক্ষমতাকে বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার ।