প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের অনুরোধে মেয়াদ শেষের আগে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভেঙে দেন রাজা তৃতীয় চার্লাস । তার জেরে বৃহস্পতিবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্রিটেনে । কিন্তু রাজা ও রাজ পরিবারের সদস্যরা কি সেদেশের ভোট প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন?
ব্রিটেনে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকরের আগে, এখনও রাজা বা রানির অনুমতি নিতে হয় । গত কয়েক শতাব্দী ধরে সেদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে রাজার ক্ষমতা প্রায় শূন্য হলেও, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতীকী প্রধান হিসেবে রাজার অধিষ্ঠান আজও অটুট । ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচনের জন্য ভোটগ্রহণ বৃহস্পতিবার । কিন্তু রাজা ও রাজপরিবারের সদস্যরা কি ভোট দিতে পারেন ? তারা কি আদৌ ভোট দেন?
লন্ডনের একটি জনপ্রিয় দৈনিকের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ভোট এলেই সামনে চলে আসে এই সব প্রশ্ন । কিংস কলেজ লন্ডনের সাংবিধানিক আইনের অধ্যাপক রবার্ট ব্ল্যাকবার্ন জানিয়েছেন, রাজা ও রাজ পরিবারের বাকি সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে ব্রিটিশ আইনে । তাঁর মতে, রাজা ও রাজ পরিবারের সক্রিয় সদস্যরা আইনত অন্যান্য যোগ্য নাগরিকের মত একইভাবে সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন । তবে বাস্তবে তাঁরা সেটা করেন না । তার নেপথ্যে রয়েছে অন্য কারণ । অধ্যাপক ব্ল্যাকবার্নের মতে, রাজ পরিবারের সদস্যরা ভোট দিতে গেলে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জল্পনা-কল্পনা তৈরি হতে পারে । সাংবাদিকরা ঘিরেও ধরতে পারেন । তাতে বিশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে আইনের লঙ্ঘনও ঘটতে পারে । ফলে সাংবিধানিক প্রয়োজনেই তাঁরা কঠোরভাবে ‘রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা’ বজায় রাখেন ।
রাজনৈতিক ভাষ্যকার রিচার্ড ফিটজউইলিয়ামস
রাজনৈতিক ভাষ্যকার রিচার্ড ফিটজউইলিয়ামস জানিয়েছেন, ব্রিটিশ রাজাদের একসময় উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল । কিন্তু গত তিনশ বছরে তাঁদের সেই ক্ষমতা ক্রমশ হারিয়ে গেছে । ১৭০৮ সালে রানি অ্যান ‘স্কটিশ মিলিশিয়া’ নামে একটি বিলে সই করতে অস্বীকার করেছিলেন । ওই ঘটনা রানির সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগের সর্বশেষ বড় ঘটনা বলে উল্লেখ রয়েছে ব্রিটিশ রাজনীতিতে । ফিটজউইলিয়ামস আরও বলেন, স্কটিশ মিলিশিয়াদের অস্ত্র সরবরাহের জন্য বিলটি তোলা হয়েছিল । তৎকালীন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদরা চেয়েছিলেন স্কটিশ মিলিশিয়াদের অস্ত্র দিতে । কিন্তু রানির তাতে মত ছিল না । রাজা ও রানিরা ব্রিটেনে দীর্ঘসময় ধরে সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন । তবে গত দুই শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে তাঁদের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে । রিচার্ড ফিটজউইলিয়ামস মনে করেন, কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান এবং পার্লামেন্টের নেতা নির্বাচনেও এক সময় রাজা বা রানি সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারতেন ।
১৮৯৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময় এমনটি দেখা গিয়েছিল । তখন রানি ভিক্টোরিয়া, টোরি পার্টির পছন্দ করা প্রধানমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে, তৎকালীন হুইগ পার্টির নেতার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন । এই ঘটনাটি ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে এড়িয়ে, রানির চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রয়োগের শেষ ঘটনা হিসেবে দেখা হয় । ব্রিটেনের রাজকীয় ক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে ‘নিঃশেষ’ হওয়ার পর্যায়ে আসার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ফিটজউইলিয়ামস বলেন, বিপ্লবের মাধ্যমে নয় । রাজনীতির হাত ধরেই জিনিসগুলো ক্রমশ বদলে গিয়েছে । এটাই হল ব্রিটেনের রাজনৈতিক পরিক্রমার প্রধান বৈশিষ্ট্য ।
১৯৯২ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ যখন সিংহাসনে বসেন, তখন থেকে রাজনীতিতে রাজতন্ত্রের ভূমিকা অনেক কমে যায় । তার পরেও অবশ্য রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কিছুটা রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল । অধ্যাপক ফিটজউইলিয়ামস বলেন, ষাটের দশকের গোড়ার দিকেও কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পছন্দই ছিল শেষ কথা ।
১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলান পদত্যাগ করেন । তখন রানি তাঁর পছন্দ মত একজনকে টোরিদের (কনজারভেটিভ পার্টি) প্রধানের পদে বসিয়ে, তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও সমর্থন দেন । সেই ঘটনার পর, ১৯৬৫ সালে পার্টির প্রধান নির্বাচনের চূড়ান্ত ক্ষমতা, রানির হাত থেকে কেড়ে নেয় কনজারভেটিভ পার্টি । অল্প সময়ের মধ্যে দলটি সিদ্ধান্ত নেয়, তাঁরা আর রানির পছন্দের ওপর নির্ভর না করে, তাঁদের পরবর্তী নেতা নিজেরাই বেছে নেবে ।
সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাজা বা রানি এবং রাজপরিবারের সদস্যরা এখন রাজনীতি এড়িয়ে চলেন । ব্রিটিশ সংবিধান অনুযায়ী, রাজা রাজনীতির ঊর্ধ্বে । এই কারণে রাজা বা রানি ব্রিটেনে কোনও নির্বাচনে ভোট দেন না। তাঁরা নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকেন । রাজনীতি আর তাঁদের বিষয় নয় । একই কারণে রাজ পরিবারের সদস্যরাও আর ভোট দিতে যান না ।
রাজনীতি ও নির্বাচনে কোন ভূমিকা না থাকলেও, খাতায় কলমে রাজা বা রানি এখনও আইন পাসে বাধা দেওয়া, নির্বাচন আহ্বান করা থেকে বিরত রাখা এবং ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন বিষয়ে তত্ত্বাবধান করার ক্ষমতা রাখেন । যদিও এই ক্ষমতা কখনোই নিরঙ্কুশ বা চূড়ান্ত নয় । কেবলই প্রতীকী মাত্র । যেমন এবারের নির্বাচনে যে দলই জিতুক না কেন, অথবা যদি সরকার গঠনে বিভিন্ন দলকে জোটবদ্ধ হতে হয়, তখন কোনও একক দলের নেতা অথবা জোট নেতাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ নিয়ে সরকার গঠনের জন্য রাজা তৃতীয় চার্লর্সের অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে । রাজা অনুমতি দেবেন, এটাই প্রথা । কারণ তিনি সাংবিধানিক রাজনীতির কোন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন না । তবু ব্রিটিশ ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে রাজ পরিবার । যা নিয়ে যথেষ্ট গর্বিত ব্রিটেনের মানুষ ।