ইদানিংকালে বলিউডের কোন সিনেমাটা আপনার খুব ভাল লেগেছে বলুন তো ? লাপাতা লেডিজ, ময়দান, দো ওউর দো প্যার, শয়তান – আর কিছু ? ভাবতে হচ্ছে তো ? কিন্তু যদি জানতে চাই সম্প্রতি আপনার দেখা কোন দক্ষিণী সিনেমার হিন্দি ডাব করা ভার্সন আপনার ভাল লেগেছে ? আমি নিশ্চিত যে নাম বলা শুরু করলে, শেষ করা মুশকিল । এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল আরও একটা নাম, আভেশাম ।
এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে কেরালা থেকে তিন যুবক হাজির বেঙ্গালুরুতে । কলেজের হোস্টেলে স্বাধীনতা নেই । তাই সেখানে না থেকে, কলেজেরই এক ক্লার্কের হোস্টেলে থাকার সিদ্ধান্ত নেয় আজু, বিবি এবং সান্থন । ভাবছেন স্বাধীনতা মানে কী ? আরে বাবা, কোনও রকম শৃঙ্খলার বাঁধন না থাকা । সব কিছুই সেখানে বেলাগাম । কিন্তু সেই সুখ তাদের খুব বেশিদিন সহ্য হল না । কারণ তাদের কলেজের সিনিয়রদের একটি গ্রুপ আছে । নাম কুট্টি গ্যাং । যার নেতা কুট্টিয়েট্টান । তাদের কথা মানতে না চাওয়ায়, একদিন আজু, বিবি এবং সান্থনকে তুলে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর করে কুট্টি গ্যাং । তারপর সন্ধি । কিন্তু অপমান ভুলতে পারে না তিন পড়ুয়া । সুযোগের অপেক্ষায় থাকে আজু, বিবি এবং সান্থন । তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, স্থানীয় কোনও সাপোর্ট । যার বলে বলিয়ান হয়ে, কুট্টি গ্যাংয়ের সঙ্গে পাঙ্গা নেবে তারা ।
কিন্তু কে তাদের সাহায্য করবে ? ঠিক এমন সময় দেবদূতের মত তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় রাঙ্গা । আধা মালায়ালি, আধা কান্নাডা এই যুবক পেশায় গ্যাংস্টার হলেও, তার হৃদয় কিন্তু খুবই নরম । সব সময় সাদা রঙের পোশাক পরতে পছন্দ রাঙ্গার । বাড়িতে মার্সেডিজ, বিএমডাব্লু দাঁড়িয়ে থাকলেও, সে নিজে চড়ে সবুজ রঙের পুরনো একটি টয়োটা কোয়ালিস গাড়ি ।
স্থানীয় একটি পানশালায় আজু, বিবি এবং সান্থানের সঙ্গে আলাপ হয় রণজিত গঙ্গাধরণ অরফে রাঙ্গার । তারপর ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয় তাদের সম্পর্ক । একদিন পানশালা থেকে তাদের হস্টেলে ফিরতে অনেক রাত হওয়ায় ওয়ার্ডেন খুব বকাঝকা করেন । তারপর ? রাঙ্গা বাহিনীর ছেলেরা এসে ওয়ার্ডেনকে মারধর করে । তিনজনকে তুলে নিয়ে যায় । কোথায় ? রাঙ্গার গোপন আস্তানায় । যে বাড়িতে একসময় রাঙ্গা নিজের ভাইকে খুন করে, রান্না ঘরের মাটিতে পুঁতে রেখেছিল । সেই বিলাসবহুল বাংলোয় ।
কলেজে যাওয়ার জন্য উপহার দেয় একটা নতুন বুলেট । সেই বুলেট নিয়ে তিন মূর্তি কলেজে গেলে, মোটরসাইকেলের ওপর নজর পড়ে কুট্টি গ্যাংয়ের । তারপর আবার চমক-ধমক । আজু, বিবি এবং সান্থন বুঝতে পারে যে তাদের হয়ে কুট্টি গ্যাংয়ের অপমানের বদলা একমাত্র নিতে পারে রাঙ্গাই । কিন্তু মাকে কথা দেওয়ার ফলে রাঙ্গা নিজে কোনও হিংসায় জড়ায় না । মারধর করে না । যা করে, তার সাঙ্গপাঙ্গরাই করে । মানে রাঙ্গার ডান হাত আমবান ।
অপরাধ জগতে রাঙ্গার হাতেখড়ি রেড্ডি ভাইয়ের হাত ধরে । একসময় ফ্রুট জুসের দোকানে কাজ করত রাঙ্গা । সেখানেই তার সঙ্গে আলাপ রেড্ডির । তারপর যা হওয়ার তাই হয়. রেড্ডি গ্রুপে যোগ দেয় রাঙ্গা । পরে, রেড্ডি গ্যাং থেকে ইস্তফা দিয়ে, সে নিজেই তৈরি করে রাঙ্গা গ্যাং । কিন্তু শত্রুতার অবসান হয় না । এদিকে কলেজে তাদের সঙ্গে কী হয়েছিল, রাঙ্গাকে সেটা খুলে বলে আজু । ব্যাস । তিন ভাইয়ের অপমানের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে রাঙ্গা ।
হোলির দিন আমবান সহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে আজুদের কলেজে হাজির হয় রাঙ্গা । তারপর যা হল, মোটামুটি সকলেই তিন মূর্তিকে সমীহ করতে শুরু করে । কিন্তু পরীক্ষার রেজাল্ট তো আর মারপিট করে ভাল করা যায় না ! তাই তিনজনেই ডাহা ফেল । কলেজের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর তাদের ডেকে পাঠায় । অশান্তি ছড়ানোর অভিযোগে কলেজ থেকে রাস্টিকেট করার কথা বলেন তিনি । কোনও মতে তাঁর হাতে পায়ে ধরে সেটা আটকায় আজু, বিবি আর সান্থন । সিদ্ধান্ত নেয়, রাঙ্গার সঙ্গ আর নয় । কিন্তু এতদিন ধরে যে জালে তারা জড়িয়ে গিয়েছে, সহজে কী আর সেটা থেকে নিস্তার পাওয়া যায় ? তাহলে তাদের লেখাপড়া, ভবিষ্যত ? তারাও কী রাঙ্গার মত গ্যাংস্টার তৈরি হবে ? নাকি ডিরেক্টরের হুমকির পর, পরীক্ষায় পাশ করে এরোনটিক ইঞ্জিনিয়ার হবে ? জানতে গেলে দেখতেই হবে ফাহাদ ফাসিল অভিনিত মালায়ালাম অ্যাকশন কমেডি ফিল্ম আভেশম.
২০২৩ সালের মার্চ মাসে নিজের দ্বিতীয় ছবির কথা ঘোষণা করেন পরিচালক জিতু মাধাভন । মে মাসে ঘোষণা হয় অফিশিয়াল টাইটেল আভেশম । প্রযোজক ফাহাদ ফাসিল নিজেই । তার সংস্থা ফাহাদ ফাসিল অ্যান্ড ফ্রেন্ডস-এর ব্যানারেই তৈরি হয় এই অ্যাকশন কমেডি মুভি । অনেকেই ভেবেছিলেন, জিতুর প্রথম ছবি রোমাঞ্চম-এর সিক্যুয়াল হয়ত আভেশম । যদিও পরে পরিচালক জানিয়ে দেন যে রোমাঞ্চম-এর সঙ্গে আভেশম-এর কোনও সম্পর্কই নেই । আমবানের চরিত্রের জন্য সাইন করানো হয় সাজিন গোপুকে । জিতুর রোমাঞ্চম ছবিতেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন সাজিন । এছাড়াও একটি ছোট্ট রোলে অভিনয় করেন আশিস বিদ্যার্থী । তিন কলেজ পড়ুয়ার চরিত্রে ফাটিয়ে অভিনয় করেন রোশন শাহনাওয়াজ, হিপজস্টার এবং মিঠুন জয়শঙ্কর । কুট্টির চরিত্রে মিধুট্টি ।
২০২৩ সালের মে মাসেই শুরু হয় শুটিং । শেষ হয় নভেম্বর মাসে । মূলত বেঙ্গালুরু শহরজুড়ে চলে শুটিং । পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ শেষ করতে আরও কয়েক মাস লেগে যায় । তারপর ২০২৪ সালে , ১১ এপ্রিল মালায়ালাম ভাষায় দেশজুড়ে মুক্তি পায় আভেশম । জুন মাসের আঠাশ তারিখ, হিন্দির পাশাপাশি তামিল, তেলেগু, কান্নাডা ভাষাতেও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পায় আভেশম । ছবির বাজেট ছিল ৩০ কোটি টাকা । আর বক্স অফিসে আয় হয় দেড়শ কোটি টাকা । মানে পাঁচগুণ বেশি । বিদেশের মাটিতেও ভাল ব্যবসা করে আভেশম । জিতু মাধভনের এই সিনেমা, মালায়ালাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে লক্ষ্মী লাভের সর্বকালী রেকর্ডে আপাতত চতুর্থ স্থানে । চলতি বছরের হিসেবে, তৃতীয় স্থানে । শুধু তাই নয় – দক্ষিণি ছবির ক্ষেত্রে এবছর যে সব ছবি বক্স অফিসে ভীষণ ভাবে সফল, সেই তালিকায় আভেশম এখনও পর্যন্ত পঞ্চম স্থানে । যেহেতু ওটিটি-তে এসে গেছে এই সিনেমার হিন্দি ভার্সন, তাই আর দেরি না করে, দেখে নিতেই পারেন দক্ষিণের জনপ্রিয় সিনেমা ।