দেবরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়
উত্তরাখণ্ডের একটি ছোট্ট গ্রাম রাউতু । খুন তো অনেক দূরের কথা । গত দশ বছরে এখানে কোনও অপরাধই হয়নি । সেই গ্রামেই উদ্ধার দৃষ্টিহীনদের বোর্ডিং স্কুলের মহিলা ওয়ার্ডেনের দেহ । খবর পেয়ে ওই বোর্ডিং স্কুলে যায় পুলিস । তদন্তে নেমেই রহস্যের গন্ধ পান SHO দীপক নেগি । এটাই পরিচালক আনন্দ সুরাপুরের নতুন ছবি রাউতু কা রাজ ।
যে কোনও সিনেমার কাস্টিংয়ে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর নাম থাকা মানেই, সেটাকে ঘিরে দর্শকদের কাছে একটা বাড়তি আকর্ষণ তৈরি হয় । পরিচালক আনন্দ সুরাপুরের নতুন ছবি রাউতু কা রাজ-কে কেন্দ্র করেও তেমনটা ছিল । কিন্তু শেষরক্ষা হল না । কারণ, দুর্বল চিত্রনাট্য ।

শুরুটা হয়েছিল ভালই । উত্তরাখণ্ডের ছোট্ট গ্রাম রাউতু কি বেলি-র মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠা দৃষ্টিহীনদের বোর্ডিং স্কুল সেবাধাম । সেখানেই নিজের ঘরের মধ্যেই উদ্ধার হয় মহিলা ওয়ার্ডেন সঙ্গীতার দে । তদন্তে, রাউতু থানার সাব ইন্সপেক্টর নরেশ প্রভাকর ডিমরিকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান SHO দীপক নেগি । দেহ দেখে তাঁর সন্দেহ হয়, এটা ন্যাচরাল ডেথ নয় । মৃত্যুর পিছনে রয়েছে রহস্য । ভিসেরা রিপোর্টও সেদিকেই ইঙ্গিত করে । কিন্তু তদন্তে প্রভাব খাটাতে শুরু করেন স্থানীয় শিল্পপতি তথা ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মনোজ কেসরি ।
তদন্ত থামাতে পুলিসের উপর মহল থেকে চাপ আসতে থাকে নেগির কাছে । কিন্তু তিনিও হাল ছাড়বার পাত্র নন । তদন্তে নেমে দীপক নেগি জানতে পারেন, সেবাধাম স্কুলের অন্দরটা যথেষ্টই অন্ধকারাচ্ছন্ন । কারণ মনোজ কেসরির সঙ্গে একটা পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন ওয়ার্ডেন সঙ্গীতা । স্কুলের নিরাপত্তারক্ষী থেকে শুরু করে প্রিন্সিপ্যালের ঘনিষ্ঠদের দাবি, রাউতুতে থাকাকালীন প্রায় প্রতি রাতেই মনোজ কেসরি আসতেন ওয়ার্ডেনের ঘরে ।

কিছুদিন আগে, পারুল নামে এক পড়ুয়া নিখোঁজ হয় । অথচ সে সম্পর্কে থানায় কোনও অভিযোগ জানানো হয়নি । একটি ছেলের সঙ্গে একটি মেয়ের বন্ধুত্ব হওয়ায়, ওয়ার্ডেনের নির্দেশে সেই মেয়েটিকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় । এরকম অনেক ঘটনাই নজরে আসে SHO দীপক নেগির । এখানেই শেষ নয় । দুঁদে পুলিস অফিসার জানতে পারেন, সেবাধাম স্কুলের জমি বিক্রির প্রক্রিয়াও চলছিল জোর কদমে । তার জন্য মোটা টাকার লেনদেনও শুরু হয়েছিল । সেই টাকার কিছুটা উদ্ধারও হয় নিহত ওয়ার্ডেনের ঘর থেকে ।
ঘটনাচক্রে গ্রেফতার করা হয় বেশ কয়েকজনকে । এভাবেই রহস্যের যে জাল বুনেছিলেন পরিচালক আনন্দ সুরাপুর, ক্রমশ সেটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে থাকেন SHO দীপক নেগি । ঘন ঘন মনোজ কেসরির বাড়িতে গিয়ে জেরা করা । সেবাধাম স্কুলে গিয়ে পড়ুয়া তথা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে কথা বলা । ওয়ার্ডেন খুনের তদন্ত চলাকালীন SHO-র যাবতীয় পদক্ষেপে চাপ বাড়তে থাকে মনোজ কেসরির । তিনি লখনউতে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে, পুলিস তাকে রাউতু কি বেলি ছাড়তে নিষেধ করে । পুলিসের আতশকাঁচের নিচে যে তিনিই, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না মনোজের ।
নিরুপায় হয়ে তদন্ত বন্ধের জন্য রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বারস্থ হন তিনি । নিজেকে ও নিজের পরিবারকে বাঁচাতে, যে জমিতে গড়ে উঠেছিল তাঁর সাধের সেবাধাম স্কুল, মন্ত্রী ঘনিষ্ঠ বিল্ডারকে সেই জমি বিক্রি করতে রাজি হন কেসরি । ঠিক তখনই সব হিসেব উল্টে দেন দীপক নেগি । মন্ত্রীর ঘরে যখন লেনদেনের কথা চলছিল, সেখানেই দীপক নেগি দাবি করেন যে রাউতু কি রাজ খুলে গেছে । মহিলা ওয়ার্ডেনকে কে মেরেছে, সেটা তিনি জেনে গিয়েছেন । তবে সেটা মনোজ কেসরি নন ।

আপাতত এই পর্যন্ত সিনেমাটি বেশ গতিশীল ছিল । মানে রাউতু কি রাজ খোলার আগে পর্যন্ত । তারপরই সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যায় । ওয়ার্ডেনের খুন, পারুল নামক ছাত্রীর হারিয়ে যাওয়া, SHO দীপক নেগির অতীত – দর্শকদের কাছে কেমন যেন সব কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে যায় । বিশেষ করে ক্লাইম্যাক্সের দৃশ্য, যেখানে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরছেন দীপক, সেখানেই ব্যাক অফ দ্য মাইন্ডে কীভাবে রহস্যের জাল খুলল, সেটার ব্যাখ্যা দেওয়া – সিনেমার ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে খুব দুর্বল চিত্রনাট্যে । ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা চিঠি অনেক কথা বললেও, দীপক নেগির অতীতের অন্ধকারে কিন্তু আলো জ্বালাতে পারলেন না পরিচালক । ফলে বহু প্রশ্নের উত্তরই কিন্তু দর্শকদের কাছে অস্পষ্টই রয়ে গেল ।

যেহেতু এই সিনেমার প্রেক্ষাপট ছিল উত্তরাখণ্ডের ছোট্ট গ্রাম রাউতুতে, তাই প্রথমে এই সিনেমার নাম ছিল রাউতি কে বেলি । পরে সেটা বদল করে রাখা হয় রাউতু কি রাজ । দীপক নেগির চরিত্রে নওয়াজউদ্দিন একাই একশো । সাব ইন্সপেক্টর ডিমরির ভূমিকায় রাজেশ কুমার কিন্তু সেভাবে দাগ কাটতে পারলেন না । বিভিন্ন টেলি সিরিয়লে তিনি যতটা সাবলীল ভাবে অভিনয় করেন, নওয়াজের সঙ্গে তাঁর অভিনয় কিন্তু মনে ধরল না । তবে তিনি ত্রুটি রাখেননি । শিল্পপতি মনোজ কেসরির চরিত্রে অতুল তিওয়ারিও ওয়েব সিরিজ মহারানী-তে যতটা দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন, এখানে সেই ঝাঁঝ চোখে পড়ল না ।
গতবছর গোয়ায় আয়োজিত চুয়ান্নতম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম দেখানো হয় রাউতু কা রাজ । তারপর জুন মাসের ২৮ তারিখ একটি জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পায় আনন্দ সুরাপুরের এই ক্রাইম থ্রিলার । ছবির গল্প, চিত্রনাট্য যেমনই হোক না কেন, রাউতু কা রাজ দেখতে বসলে, সেখানাকার মনোরম পরিবেশ কিন্তু মন ভাল করে দেবেই ।
- সন্দেশখালি দুর্ঘটনায় মামলা দায়ের ন্যাজাট থানায়, অভিযুক্ত ৮ - December 11, 2025
- ইন্ডিগোর সমস্যা নিয়ে সরব মুখ্যমন্ত্রী, কংগ্রেস - December 8, 2025
- সংসদে কংগ্রেসকে নিশানা নরেন্দ্র মোদীর - December 8, 2025

