উপলক্ষ একটা বিয়ে । সেখানে একাধিক পরিবারের জমায়েত । হবু বর-বধূর মুখে উৎকন্ঠা । তাঁদের মানসিক সাপোর্ট দিচ্ছেন বন্ধুরা । আর আত্মীয়সজন ব্যস্ত, দুই পরিবারের মধ্যে বাড়তে থাকা সমস্যার সমাধানে । আর এই সবকিছুই হাসির রসে ম্যারিনেট করে, দর্শকদের উপহার দিয়েছেন পরিচালক বিপিন দাস । ছবির নাম গুরুভায়ুর আম্বালানাদাইল ।
পরিচালক বিপিন দাস । মলিউডে এখন একটি অতি পরিচিত নাম । ২০১৬ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম ছবি মধুগাউভ । বাংলায় যার অর্থ – চুম্বন । সেটি ছিল একটি কমেডি মুভি ।২০২২ সালে দু-দু’টি ছবি পরিচালনা করেন বিপিন দাস । একটি ছিল অন্তাকশরি । সাইজু কুরুপ, প্রিয়াঙ্কা নায়ার, কোট্টায়াম রামেশ, সুধি কোপ্পা অভিনীত এই ক্রাইম থ্রিলারেও ছিল হাস্যরস । দর্শকরা ভীষণ ভাবে উপভোগ করেছিলেন সেই সিনেমা । এরপর মুক্তি পায় জয়া জয়া জয়া জয়া হে । দর্শনা রাজেন্দ্রন, ব্যাসিল জোসেফ, অঞ্জু ভার্গিস অভিনীত এই ছবিও ছিল কমেডি ঘরানার । আর ২০২৪ সালে তাঁর পরিচালিত ছবি গুরুভায়ুর আম্বালানাদাইল তো ব্লকবাস্টার হিট । গল্প খুব সাধারণ ।
দুবাইয়ে কর্মরত ভিনু রামচন্দ্রণের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয় কেরালার তরুণী অঞ্জলীর । তাঁর দাদা আনন্দন আবার জামশেদপুরে একটি ফ্যাক্টরির প্লান্ট ম্যানেজার । পাঁচ বছর আগে ভিনুর সঙ্গে ব্রেক আপ হয়েছিল তাঁর বান্ধবী পারভথির । সেই মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারছিল না ভিনু । তাই আর বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও হারিয়ে ফেলেছিলেন দুবাইয়ের যুবক । আর এখানেই তাঁকে বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য মানসিক ভাবে মোটিভেট করতে শুরু করেন আনন্দন । একটা সময় আসে, যখন অঞ্জলীকে বিয়ে করতে রাজি হয় ভিনু ।
কিন্তু এই কাজ করতে করতে, তাঁর জীবনে অঞ্জলীর থেকে আনন্দনের গুরুত্ব বেড়ে যায় কয়েকগুন । শয়নে, স্বপনে ভিনু কেবল তাঁর কথাই চিন্তা করে । ইতিমধ্যেই ভিনু জানতে পারে যে প্রেম কিংবা ভালবাসা নিয়ে আনন্দন তাঁকে যতই উপদেশ দিক না কেন, তাঁর নিজের জীবন কিন্তু বিচ্ছেদে ভরা । মানে, কয়েক বছর আগেই স্ত্রীর সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্কে ইতি টেনেছেন আনন্দন । কেন ? একটি চিঠি । যেটা তাঁর স্ত্রীর প্রাক্তন প্রেমিকের পাঠানো বলেই মনে করে আনন্দন । সেই থেকেই দু’জনের দু’টি পথ আলাদা হয়ে যায় ।
এই খবর শোনার পর শোকে ভেঙে পড়েন অঞ্জলীর হবু স্বামী । হবু জামাইবাবুর জীবনকেও আনন্দময় করে তুলতে মরিয়া হয়ে ওঠে ভিনু । সিদ্ধান্ত নেয়, অঞ্জলীর সঙ্গে যেদিন তাঁর বিয়ে হবে, সেই মঞ্চেই আনন্দনের পাশে থাকবে তাঁর স্ত্রী । এতদিন যে ভোকাল টনিক তাঁকে দিত আনন্দন, এবার সেই ধাঁচেই বড় ভাইকে বোঝাতে শুরু করলেন ভিনু । তাতে কাজও হল । শ্বশুরবাড়ি গিয়ে স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনলেন আনন্দন ।
তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ । যখন নিজের স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করাতে, ভিনুকে আমন্ত্রণ জানালেন আনন্দন । হবু বৌদিকে দেখেই ভিনু চিনতে পারলেন, মারাত্মক ভুল হয়ে গিয়েছে । কারণ আনন্দনের স্ত্রীই হলেন তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা পারভথি । কিন্তু দু’জনেই দু’জনকে না চেনার ভান করলেন । এদিকে বিয়ের তোরজোড় চলছে জোর কদমে । অথচ এই বিয়েতে আর মন নেই ভিনুর । কারণ কোনও ভাবেই সে এমন একটা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না, যার সঙ্গে যোগ রয়েছে পারভথির ।
নানান অছিলায় চলল বিয়ে ভাঙার কাজ । অবশেষে বরফ গলে । অঞ্জলীর সঙ্গে মিটমাট হয়ে যায় ভিনুর । ঠিক সেই সময় আনন্দন জানতে পারে যে তাঁর স্ত্রীর প্রাক্তন প্রেমিকই হল ভিনু । এবার যে কাজটা করতে চেষ্টা করছিল ভিনু, মানে বিয়ে ভাঙার কাজ, এবার সেটাই করতে উঠে পড়ে লাগল আনন্দন । সত্যিই কী তাহলে অঞ্জলি আর ভিনুর বিয়ে হয়েছিল ? এটাই হচ্ছে বিপিন দাস পরিচালিত গুরুভায়ুর আম্বালানাদাইল-এর সারমর্ম ।
২০২৩ সালে এই ছবির কাজ শুরু হয় । তখন ভিনুর চরিত্রের জন্য প্রযোজকের পছন্দ ছিল মলিউড সুপারস্টার পৃথ্বীরাজ সুকুমারণ । সেই মত চিত্রনাট্যকার দীপু প্রদীপ, ছবির গল্প শুনিয়েছিলেন সুকুমারণকে । তখন ঠিক ছিল অন্য কেউ পরিচালনা করবেন । কিন্তু পরিচালকের হট সিটে বিপিন দাস বসতেই, সবকিছু বদলে যায় । আনন্দনের চরিত্রের জন্য বেছে নেওয়া হয় পৃথ্বীরাজকে । ভিনুর চরিত্রে সই করানো হয় ব্যাসিল জোসেফকে ।
২০২৩ সালের ১২ মে থেকে শুরু হয় শুটিং । পেরুমবাভুরের কারাট্টুপাল্লিক্কারায় তৈরি করা হয় ত্রিচুরের ঐতিহ্যশালী গুরুভায়ুর মন্দিরের সেট । শুটিং টিমে পৃথ্বীরাজের যোগদান হয় অনেক পরে । নভেম্বর মাসে । চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শেষ হয় ছবির শুটিং । মে মাসের ষোলো তারিখ দেশজুড়ে মুক্তি পায় মালায়ালাম ভাষায় নির্মিত কমেডি ফ্যামিলি ড্রামা গুরুভায়ুর আম্বালানাদাইল । বাংলায় যার মানে হল গুরুভায়ুর মন্দিরের সামনে ।
পৃথ্বীরাজ সুকুমারণ, ব্যাসিল জোসেফ ছাড়াও এই সিনেমায় অভিনয় করেন নিখিলা ভিমল, অনস্বারা রাজন, যোগী বাবু, জগদীশ, অঞ্জু ভার্গিস, বাইজু সন্তোশ এবং একটি বিশেষ চরিত্রে দেখা যায় অরবিন্দ আকাশকে । ছবিটি বাণিজ্যিক ভাবে ভীষণ সফল হয় । বক্স অফিসে লক্ষ্মী লাভের সর্বকালীন অঙ্কের নিরিখে মালায়ালাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে গুরুভায়ুর আম্বালানাদাইল-এর স্থান অষ্টমে । আর আপাতত এবছরে পঞ্চম । সিনেমা হলগুলিতে ভীষণ ভাবে সাড়া পাওয়ার পর, জুন মাসের ২৭ তারিখ থেকে ওটিটি-তে রিলিজ করেছে এই সিনেমা । মালায়ালাম ভাষার পাশাপাশি হিন্দি, তামিল, তেলুগু এবং কান্নাডা ভাষাতেও ডাব করে রিলিজ করেছে এই সিনেমা. যার ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে ছায়া পড়েছে জনপ্রিয় পরিচালক প্রিয়দর্শনের । তাঁর ছবি যেমন দর্শকদের হাসির ফোয়ারায় স্নান করিয়ে দিত, তেমনই কিন্তু বিপিন দাসের গুরুভায়ুর আম্বালানাদাইল । হলে দেখার সৌভাগ্য না হলেও ক্ষতি নেই । কারণ এখন তো ওটিটি প্ল্যাটফর্মে হিন্দিতে ডাব করা ভার্সনই এসে গেছে । তাই এই কমেডি ড্রামা কিন্তু একদমই মিস করার নয় ।