চাঁদ তুমি কার ?

মান্না দে-র একটা গান আছে না, ‘চাঁদ দেখতে গিযে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি’ । ইদানিং যে হারে মানুষ এখন চাঁদে য়াওযার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে, তাতে গানের কথা যদি এরকম হয় – ‘চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি, জমি কিনে ফেলেছি’, তাহলে কিন্তু অবাক হওযার কিছুই নেই । কেন ? মহাকাশে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে, এরই মধ্যে চাঁদে পাড়ি জমানোর পরিকল্পনা করছে বেশ কিছু দেশ ও বহুজাতিক সংস্থা.তবে চাঁদে নতুন যুগ শুরু করার জন্য মানুষ আদৌ প্রস্তুত কি না – সেটাই এখন বড় প্রশ্ন ।

সম্প্রতি চাঁদে চিনের পতাকা ওড়ার ছবি দেখেছে গোটা বিশ্ব । যেখানে প্রথমবার কোন মিশনে, চাঁদের দূরবর্তী দিকের পৃষ্ঠ থেকে ভূপৃষ্ঠে নমুনা নিয়ে আসার কৃতিত্ব অর্জন করেছে বেজিং । এটা ছিল চিনের কোনও মহাকাশযানের চঁদের মাটিতে পা রাখার চতুর্থ ঘটনা ।
গত এক বছরে ভারত এবং জাপান চাঁদের মাটিতে নিজেদের চন্দ্রযান পাঠিয়েছে । এ ছাড়া, ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বের প্রথম প্রাইভেট কোম্পানি হিসেবে চাঁদে ল্যান্ডার পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইনটুইটিভ মেশিনস’। আর এরকমই আরও কয়েকটি পরিকল্পনা পাইপলাইনে আছে ।

এদিকে, আর্টেমিস মিশনের মাধ্যমে ২০২৬ সালে চাঁদের মাটিতে মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে নাসা । পাশাপাশি, ২০৩০ সালে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনার কথা বলেছে চিনও । এটা কিন্তু ক্ষণস্থায়ী ভ্রমণ নয় । বরং চাঁদে স্থায়ী বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে চিনের । আর এখান থেকেই বিশেষশ্রদের ধারনা,
এবার নতুন ‘স্পেস রেস’-এর এই উত্তেজনা ছড়িয়ে যেতে পারে পৃথিবী থেকে চাঁদ পর্যন্ত । ‘খুব শিগগিরই চাঁদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের একটা মৌলিক পরিবর্তন হতে যাচ্ছে’ । সতর্ক করে বলেছেন ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যানসাস’-এর ভূতত্ত্ববিদ জাস্টিন হলকম্ব । তিনি আরও যোগ করেন, মহাকাশ গবেষণার গতি ‘আমাদের আইনকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে’ ।

১৯৬৭ সালে রাষ্ট্রসংঘের একটি চুক্তিতে বলা হযেছে, কোন একক দেশ চাঁদের মালিক হতে পারবে না । এর বিপরীতে, ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ নামে পরিচিত এই চুক্তিতে উল্লেখ আছে, চাঁদের মালিকানা সবার. আর চাঁদের ওপর যে কোনো ধরনের গবেষণা বা অনুসন্ধাকার্য, মানবজাতি ও সকল দেশের স্বার্থে পরিচালনা করতে হবে ।

বিষয়টি খুবই শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক শোনালেও, পারস্পরিক সহযোগিতা এই চুক্তির একটি অঙ্গ শক্তি ছিল, তেমনটা কিন্তু নয় । বরং এর পিছনে রয়েছে ঠান্ডা একটি স্নায়ু যুদ্ধের রাজনীতি । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকায়, মহাকাশ একটি সামরিক রণক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে । এমন একটা আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তাই এই শান্তি চুক্তির মূল শর্ত ছিল, মহাকাশে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র পাঠানো যাবে না । যেখানে স্বাক্ষর করেছে শতাধিক দেশ । তবে, নতুন এই মহাকাশ যুগটি, আগের যুগের তুলনায় কিছুটা অন্যরকম বলেই মত বিশেষশ্রদের ।

এর মধ্যে বড় একটি পরিবর্তন হল, বর্তমানে চাঁদে কোনও অভিযান চালানোর বিষয়টি শুধু বিভিন্ন দেশের মধ্যেই সীমিত নয়, বরং বিভিন্ন কোম্পানিও এই প্রতিযোগিতায় নেমেছে । জানুয়ারিতে ‘পেরেগ্রিন’ নামক এক মার্কিন বাণিজ্যিক মিশনে ঘোষণা করা হয়েছিল, তারা চাঁদে মানুষের অস্থি, ডিএনএ নমুনা ও একটি স্পোর্টস ড্রিংক নিয়ে যাচ্ছে ।
যদিও রকেটের ফুয়েলে ছিদ্র ধরা পড়ায়, সেটা কিন্তু কার্য়কর হয়নি । তবে, এমন অভিযান কীভাবে শান্তি চুক্তির সঙ্গে যায়, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে. চুক্তিতে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা আছে, যে কোনো ধরনের মহাকাশ অনুসন্ধান, সমগ্র মানবতার জন্য লাভজনক হতে হবে ।
‘চাঁদ এখন আমাদের নাগালের মধ্যেই থাকায় আমরা এর অপব্যবহার শুরু করছি’ । মন্তব্য, মহাকাশ বিষয়ক আইনজীবি ও অ্যাপোলো মিশনের বিভিন্ন ‘ল্যান্ডিং সাইট’ সুরক্ষিত রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করা অলাভজনক সংস্থা ‘ফর অল মুনকাইন্ড’-এর প্রতিষ্ঠাতা মাইলেক হ্যানলনের ।

এদিকে, চাঁদের প্রতি ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর মনোযোগ বাড়লেও, এর পরেও কিন্তু চাঁদের নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট দেশের হাতেই থাকবে । ‘লন্ডন ইনস্টিটিউট অফ স্পেস পলিসি অ্যান্ড ল’-এর পরিচালক সইদ মসতেহসার বলছেন, ‘মহাকাশে মিশন পরিচালনার জন্য বেসরকারি সংস্থাগুলিকে এখনও নিজ দেশের অনুমতি নিতে হয়. আর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায়, সেটিও ক্রমশ সীমিত করা হবে’ ।

চাঁদে অবতরণ করা দেশগুলোর অভিজাত ক্লাবে যোগ দেওয়া, এখনও খুবই সম্মানজনক বিষয় । উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, চাঁদে সফল মিশন পরিচালনা করে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠার দামামা বাজিয়ে দিয়েছে ভারত ও জাপান ।
এ ছাড়া, মহাকাশ শিল্পে সফল দেশগুলো কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতিতেও বড়সড় সাফল্য বয়ে আনতে পারে. তবে, চাঁদ নিয়ে এই প্রতিযোগিতার নেপথ্যে লুকিয়ে আছে আরও বড় পুরস্কার. সেটা হল, চাঁদের প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার ।

চাঁদের ভূখণ্ড দেখতে অনুর্বর হলেও, এতে বেশ কিছু খনিজ পদার্থ, যেমন বিরল ধরনের মাটি, লোহা ও টাইটেনিয়ামের মতো ধাতু – এমনকি হিলিয়ামও আছে । যা বিভিন্ন সুপারকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, সবকিছুতেই ব্যবহৃত হয় ।

১৯৭৯ সালে এক আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তিতে ঘোষণা করা হয়েছিল, কোনও দেশ বা প্রতিষ্ঠান কিন্তু চাঁদে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা দাবি করতে পারবে না । তবে, এই প্রস্তাবে তেমন ভাবে সাড়া মেলেনি । মাত্র ১৭টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে ।
২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি আইন পাশ হয় । যেখানে বলা হয়েছে, মহাকাশ থেকে পাওয়া যে কোনো বস্তুকে পরিশোধন, ব্যবহার ও বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে মার্কিন নাগরিক ও শিল্প সংস্থাগুলোকে ।

‘যার ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল’, সংবাদ সংস্থাকে বলেন মাইকেল হ্যানলন । তিনি আরও বলেন, আগামী দিনে ধীরে ধীরে হয়ত অন্যান্য দেশও একই ধরনের আইন আনতে শুরু করবে. যার মধ্যে রয়েছে লুক্সেমবর্গ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান এবং ভারতও ।

চাঁদের মাটিতে সবচেযে দামি উপাদান কী ? জল । চাঁদ থেকে অ্যাপোলো মিশনের নভোশ্চররা যখন প্রথমবারের মতো নুড়িপাথর নিয়ে এসেছিলেন, সে সময় প্রাথমিক বিশ্লেষণে সেগুলোকে পুরোপুরি শুকনা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল । দাবি ব্রিটেনের ‘ন্যাশনাল হিস্টরি মিউজিয়াম’-এর গ্রহ বিভাগের অধ্যাপক সারা রাসেলের । ‘তবে, বছর দশেক আগে এক ধরনের বিপ্লব ঘটে যায় । যেখানে আমরা জানতে পারি, ফসফেট স্ফটিকওয়ালা এইসব পাথরের মধ্যে আসলে জলের ছোট ছোট ফোঁটা লুকিয়ে আছে’ । তার আরও দাবি, চাঁদের দুই মেরুতে থাকা ছায়াযুক্ত গর্তগুলোর মধ্যে আরও অনেক বরফ হয়ত জমে আছে’ ।

চাঁদের মাটিতে জলের খোঁজ যখন মিলেছে, তখন কি আর কেউ চুপ করে বসে থাকতে পারে ? তাই এখন ‘স্পেস ওয়ার’-এর পর, শুরু হয়েছে ‘মুন ওয়ার’ । কিন্তু চাঁদের মাটি কী বিক্রয়যোগ্য ? উঠছে প্রশ্ন । উত্তর মিলবে কী ?

নিউজ টাইম চ্যানেলের খবরটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
Inform others ?
Share On Youtube
Show Buttons
Share On Youtube
Hide Buttons
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
Facebook
YouTube