শিবরাত্রীর আগে সেজে উঠছে মুর্শিদাবাদের চন্দনবাটি শিবলিঙ্গ মন্দির

মুর্শিদাবাদ জেলার প্রাচীন শিবলিঙ্গ মন্দির হিসাবেই পরিচিত সাগরদিঘীর চন্দনবাটি শিবলিঙ্গ মন্দির । সামনেই শিবরাত্রী, আর তার আগে সেজে উঠছে এই মন্দির । পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ মন্দির হিসাবেই পরিচিত ।

ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ জেলার ভাগীরথী নদীর পশ্চিম পাড়ের ভূখণ্ড অনেক প্রাচীন । এই স্থান রাঢ় অঞ্চল নামে পরিচিত । অপ্রদিকে পূর্ব পাড়ের ভূখণ্ড বাগরি অঞ্চল নামে পরিচিত যা তুলনায় অনেক নবীন । অতীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নৃপতির বিজিত রাজ্যের রাজধানী হওয়ার সুবাদে অসংখ্য স্থাপত্য গড়ে উঠেছিল এই জেলায় । সেই সকল অতি প্রাচীন স্থাপত্য অধিক সমৃদ্ধ করেছে এই রাঢ় অঞ্চলকে ।

মৌর্য, গুপ্ত, সেন, পাল ইত্যাদি রাজাদের রাজত্বকালে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপত্য আজকে কালের গর্ভে । আবার ক্ষীণ হলেও কিছু স্থাপত্য আজও অতীত গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় । মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদীঘির কাছে চন্দনবাটিতে অবস্থিত চন্দনবাটি শিব মন্দির আজও সেই গর্বিত অতীত অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।

মন্দিরটি তুলনায় নবীন হলেও অধিষ্ঠিত শিবলিঙ্গটি অনেক প্রাচীন । খুব সম্ভবত সেটি পাল আমলের । পাল ও সেন আমলে চন্দনবাটি শিব মন্দির সংলগ্ন এই অঞ্চলটি মৃত্যুঞ্জয়পুর নামে পরিচিত ছিল । কিন্তু কালের বিবর্তনে এই প্রাচীন ইতিহাস মাটির নিচে চাপা পড়ে যায় । বিষয়টি সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে আসে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে । বাংলা ১৩৩৪ সাল নাগাদ প্রাচীন এই মৃত্যুঞ্জয়পুর, জিয়াগঞ্জের নেহালিয়া রাজবংশের উত্তর পুরুষ সুরেন্দ্র নারায়ণ সিংহের জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত ছিল । সেই সময় এই জেলার প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক পুরাসম্পদ সংগ্রহে সুরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন । সেই সূত্রে রায়বাহাদুর সুরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ তার বন্ধু আজিমগঞ্জ নিবাসী জমিদার নির্মল কুমার সিংহ নওলক্ষাকে চন্দনবাটি সংলগ্ন এই অঞ্চলে খননের কাজ করবার অনুরোধ করেন । জমিদার নির্মল কুমার সিংহ নওলক্ষা স্বশরীরে উক্ত খননকার্য পরিচালনা করেন । এই খননের ফলে নব কলেবরে উদ্ভাসিত হয় এক প্রাচীন ইতিহাস ।

১৩৩৫ সালে খনন কার্য শেষ হলে পাওয়া যায় অসংখ্য প্রত্ন সামগ্রী । এর মধ্যে অন্যতম একটি বিশালাকার শিবলিঙ্গ ও পাল আমলের প্রাচীন একটি শিব মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ । প্রায় ১২ ফুট মাটির নিচে পাওয়া উক্ত শিব লিঙ্গের উচ্চতা প্রায় ৪ ফুট । খনন কার্যের ফলে সৃষ্ট সেই গর্তে গজিয়ে ওঠা আগাছার ভেতরে এখনও প্রাচীন মন্দিরের ভিত্তিভূমির ছোটো বাংলা ইঁটের গাঁথুনি চোখে পড়ে । নোনাধরা সেই ইঁটের ফাঁকে হয়তো অসংখ্য না-জানা ইতিহাস আজও লুকিয়ে রয়েছে ।

অসংখ্য ঘটনাবহুল অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েও যেন ভীষণ নিরবতা । ১৩৬০ বঙ্গাব্দে কালুরাম রামচাঁদ রঘুনাথ সাদানী নামে একজন জনৈক ব্যবসায়ী এই উৎখননের এলাকায় ১০ বিঘা জমি নিয়ে একটি মন্দির নির্মাণ করেন এবং সেবাইত হিসেবে মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেন । মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে পাল আমলের প্রাচীন শিব লিঙ্গটিকে এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয় । উক্ত ব্যবসায়ী স্বদেশ ত্যাগ করে এখন হয়েছেন কান্দি নিবাসী । মন্দিরের জমি ও পুজোর গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে নবগঠিত ট্রাস্টি বোর্ড । বর্তমানে নিত্য পূজা অর্চনার পাশাপাশি শিব পুর্নিমা উপলক্ষে ভক্ত সমাগম উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে যা অতীত গৌরব পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে । তাই শিবরাত্রীতে ঘুরে আসুন মুর্শিদাবাদ জেলার প্রাচীন চন্দনবাটি শিবলিঙ্গ মন্দির ।

নিউজ টাইম চ্যানেলের খবরটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
Inform others ?
Share On Youtube
Show Buttons
Share On Youtube
Hide Buttons
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
Facebook
YouTube