বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে ৭১এর ভারত-পাক যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট ও হিলির। সেনা পরিভাষায় এই এলাকার দায়িত্বে ছিল বগুড়াফ্রন্ট। সেই যুদ্ধে সব চেয়ে ভয়ঙ্কর এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়েছিল বগুড়াফ্রন্টে। সকলে যা হিলি-যুদ্ধ বা হিলি-ব্যাটেল নামেই জানেন।
১৯৭১ এর ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ দিনের লড়াই শেষে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনারা বাধ্য হয়েছিল পরাজয় স্বীকার করতে। সেদিন ৯০ হাজারেরও বেশি পাক সেনা আত্মসমর্পণ করেছিলেন। স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ।
৭১ এর সেই যুদ্ধের কথা জানলেও, সেই যুদ্ধে হিলি ও বালুরঘাটের গুরুত্বের কথা কিন্তু অনেকেই জানেন না। জানেন না এই রণাঙ্গনে শত্রু বুলেটে জর্জরিত ভারতীয় বীর সেনাদের কথা। খোদ ভারতীয় সেনাবাহিনীর তরফেও ঘোষণা করা হয়েছিল যে ৭১ এর ভারত পাক যুদ্ধে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়েছিল বগুড়াফ্রন্টে।
সমগ্র বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকায় ভারত ও পাক সেনার মুখোমুখি যুদ্ধ হয়েছিল ১৩ দিনের। সেখানে এই হিলিতে যুদ্ধ হয়েছিল ১৫ দিন ধরে। ১৬ ডিসেম্বর সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে পাকিস্তান সেনা ভারতীয় সেনার কাছে আত্মসমর্পন করেছিল। তখনও হিলি রণাঙ্গনে কিন্তু পাক বাহিনী যুদ্ধ চালিয়েই যাচ্ছিলো। তাঁরা আত্মসমর্পন করেছিল আরও পরে ১৮ ডিসেম্বর। কারণ বগুড়া ফ্রন্টের দায়িত্বে থাকা পাক সেনার ২০৫ মাউন্টেরিইয়াং ব্রিগেদের দায়িত্বে থাকা ব্রিগেডিয়ার তাজামুল হোসেন মালিক। যিনি প্রচন্ড নিষ্ঠুর, সাম্প্রদায়িক ও রক্ত পিচাশ নামে খ্যাত ছিলেন। উল্টো দিকে ভারতীয় সেনার দায়িত্বে চলেন মেজর জেনারেল লছমন সিং লাহেল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হিলি রণাঙ্গনে পাক সেনাকে চার দিক দিয়ে ঘিরে রসদ সংগ্রহের সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এই অবস্থায় মুক্তি ফৌজের সহযোগিতায় রাতারাতি রাস্তা তৈরী করে পেছন দিক দিয়ে পাক সেনার উপর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সসস্ত্র ভারতীয় ফৌজ। অবশেষে ১৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানের মেজর জেনারেল নজর হুসেন শাহ পরাজয় স্বীকার করিয়ে বগুড়াফ্রন্টের পাক সেনাদের আত্মসমর্পন করান। আজও হিলি চেকপোস্ট এলাকায় সেদিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের গুলির চিহ্ন থাকা বাড়ি সযত্নে রেখে দিয়েছেন হিলির বাসিন্দা তথা সমাজসেবী অমূল্যরতন বিশ্বাস।
হিলি ব্যাটালের সেই যুদ্ধ পুরোটাই পরিচালিত হয়েছিল বালুরঘাট থেকে। বালুরঘাটের বিভিন্ন এলাকায় ভারতীয় সেনা শিবির করা হয়েছিল। এই শহরের উত্তর চকভবানী এলাকায় ছিল বাংলাদেশ মুক্তি যোদ্ধাদের ক্যাম্প অফিস। বর্তমান যে বাড়িটিতে ট্রাফিক পুলিশের অফিস হয়েছে।
সেই যুদ্ধে বালুরঘাটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্মরণীয় করে রাখতে পাক সেনার ব্যবহৃত ব্রিটিশ স্যাফে ট্যাঙ্ক ছিনিয়ে এনে বালুরঘাটবাসীকে স্মারক হিসেবে উপহার দিয়েছিলেন মেজর জেনারেল লছমন সিং লাহেল। বালুরঘাটের রঘুনাথপুর এলাকায় অবস্থিত সেই ট্যাঙ্কটির নামানুসারেই এলাকার নাম হয়েছে ট্যাঙ্ক মোড়।
১৯৭১ এর বাংলাদেশ যুদ্ধে ভারতীয় সেনার বহু জওয়ান শহীদ হয়েছিলেন। যুদ্ধের স্মারক হিসেবে হিলিতে শহীদদের শ্রদ্ধাঞ্জলী জ্ঞাপনে হাইস্কুল মাঠে স্থাপিত রয়েছে শহিদ বেদী । যাকে ওয়ার মেমোরিয়াল বলা হয়। যে মাঠে হিলি ব্যাটেলে শহীদ ৪০০ জন বীর জওয়ানকে দাহ করা হয়েছিল।
- সন্দেশখালি দুর্ঘটনায় মামলা দায়ের ন্যাজাট থানায়, অভিযুক্ত ৮ - December 11, 2025
- ইন্ডিগোর সমস্যা নিয়ে সরব মুখ্যমন্ত্রী, কংগ্রেস - December 8, 2025
- সংসদে কংগ্রেসকে নিশানা নরেন্দ্র মোদীর - December 8, 2025

