সম্প্রীতির এক বিরল নজির পুরুলিয়ার হিড়বহাল গ্রামের কালী মন্দির

একই মন্দিরে এক ছাদের নীচে একদিকে মা ভদ্রকালী অধিষ্ঠিত, অন্যদিকে মুসলমান সম্প্রদায়ের পীর বাবার মাজার প্রতিষ্ঠিত । কালীপুজোর দিন একই সঙ্গে মা ভদ্রকালী যেমন পূজিত হন, পাশাপাশি পীর বাবার মাজারেও চাদর চড়িয়ে পূজা অর্চনা চলে । সে সঙ্গে ওই  গ্রামের গ্রাম্য দেবতারও পূজো হয় । গ্রামের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ কালী পূজার ওই বিশেষ দিনে একই সঙ্গে সমস্ত রকম ভেদাভেদ ভুলে নিজ নিজ আরাধ্য দেব দেবীর আরাধনায় মগ্ন হন । এ যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অন্য নজির ।

পুরুলিয়া এক নম্বর ব্লকের হিড়বহাল গ্রামে রয়েছে প্রাচীন এই ভদ্রকালীর মন্দির । কথিত আছে প্রাচীনকালে গভীর অরণ্যে ঘেরা এই জায়গায় কোন এক ঋষি তপস্যা করতেন । সময়কাল হয়তো পাঁচ শত বছরেরও পুরানো হবে; সময়কাল নিয়ে দ্বিমত রয়েছে অনেকেরই । তবে সে যাই হোক, তৎকালীন সময়ে ওই ঋষিকে মা ভদ্রকালী দর্শন দেন । এবং মা তাঁকে পূজা অর্চনা করার কথা বলেন । ঋষি তখন মা কালীকে প্রশ্ন করেন তিনি কিভাবে তার পূজা অর্চনা করবেন, তাঁর কোনো সম্বল নেই । মা তখন মুনীকে বলেন শুধুমাত্র ফুল বেলপাতা ও জল দিয়েই তাঁর পূজা অর্চনা শুরু করতে ।

মা ভদ্রকালীর নির্দেশ অনুসারে তপস্যারত ওই ঋষি তখন থেকেই শুরু করেন মা কালীর পূজা অর্চনা । কিন্তু কিছু সময় পরেই ঘটে আরও এক নাটকীয় ঘটনা । গভীর অরণ্যে ঘেরা ঋষির ওই আশ্রমে সন্ন্যাসীর বেশে আবির্ভূত হন এক পীর বাবা । তিনিও ঋষিকে তাঁর পূজা-অর্চনা করার কথা বলেন । ঋষি ওই পীর বাবাকে বলেন তিনি একজন হিন্দু মুনী কিভাবে মুসলমান সম্প্রদায়ের পীর বাবার পুজো করবেন । পীর বাবা তাঁকে জানান তিনি হিন্দুদের কাছে সত্যনারায়ণ এবং মুসলমানদের কাছে পীর বাবা তাই তাঁর পুজো করার ক্ষেত্রে কোনরূপ সমস্যা নেই ।

তপস্যারত ওই ঋষি মা ভদ্রকালী এবং পীর বাবার আদেশ মতো সেই থেকে একই দিনে শুরু করেন মা কালী সহ পীর বাবার পূজা-অর্চনা । প্রাচীন সেই সময় থেকে আজও সমানে কালীপুজোর দিন হয়ে আসছে পুরুলিয়ার এই প্রান্তিক গ্রাম হিড়বহালে মা কালী ও পীর বাবার পূজার অর্চনা । শুধু পুরুলিয়া এক নম্বর ব্লকের হীড়বহাল গ্রামের মানুষেই না, এখানে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষজন পূজা অর্চনা করতে আসেন কালীপুজোর ওই  বিশেষ দিনে । টিনের ছাউনি দেওয়া একটি ঘরে বর্তমানে অধিষ্ঠিত রয়েছেন মা কালী এবং পীরবাবার মাজার । পুজোর দিনে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয় এখানে । হিন্দু এবং মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষই একত্রিত হয়ে এই পুজোপাট পরিচালনা করেন । অনেক মানুষ এখানে মানত করেন তাদের মনস্কামনা পূরণের জন্য । তাদের সেই মনস্কামনা পূরণ হওয়ার পর আবার ফিরে আসেন পুজোর এই বিশেষ দিনে ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের রাজনীতিতে যখন দেশে এক উত্তাল পরিবেশ, ঠিক তখনই কালীপুজোর এই বিশেষ সন্ধিক্ষণে পুরুলিয়া জেলার হীড়বহাল গ্রামে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অন্য নজির চোখে পড়বে । যা হয়তো মানুষকে শিক্ষা দেবে ঈশ্বর এক এবং অভিন্ন।

নিউজ টাইম চ্যানেলের খবরটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
Inform others ?
Share On Youtube
Show Buttons
Share On Youtube
Hide Buttons
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
Facebook
YouTube