আবারও উঠে আসছে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের স্মৃতি

।। সুজিত দুয়ারি ।।

“কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়েই ভোট হোক”; “সেদিন বাহিনী থাকলে ছেলেকে হারাতে হতো না” । এই কথা গুলোই বলে চলেছেন গত পঞ্চায়েত ভোটে সন্তান হারানো বৃদ্ধা মায়েরা । আর যেন কোন মায়ের কোল খালি না হয় । ২০১৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনে নির্বাচন কেন্দ্রের মধ্যেই হাবড়ায় দুজনকে পিটিয়ে খুন করা হয় । পাঁচ বছর পর আবারও এসেছে সেই অভিশপ্ত পঞ্চায়েত ভোট । মৃতদের মায়েদের দাবি আর যেন কোন মায়ের কোল খালি না হয় ।

হাবড়ার এক নম্বর ব্লকের পৃথিবা পঞ্চায়েতের যশুর এলাকায় রয়েছে মহাত্মা শিশির কুমার আদর্শ বিদ্যাপীঠ । ২০১৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনের সেদিন সকাল থেকে নির্বিঘ্নেই চলছিল ভোট প্রক্রিয়া । তবে সেদিন বিকেল থেকে জটলা শুরু হয় বুথ কেন্দ্রের বাইরে । বুথ পাহারায় তখন দুজন লাঠিধারী পুলিশ কর্মী । হঠাৎ জটলা ঢুকে যায় বুথের ভেতরে । বুথ দখলের অভিযোগ তুলে এলাকার কয়েকজন প্রতিরোধ গড়ে তোলে । দু’পক্ষের মধ্যে বেঁধে যায় ব্যাপক অশান্তি ।

সেখানেই প্রাণ হারান হাবড়া পুরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ হাবড়ার বাসিন্দা উজ্জ্বল সুর(৪৩) ও সুশীল দাস(৩৮) নামে দুই ব্যক্তি । বাড়ি থেকে তৃণমূল কর্মী সমর্থকরা ভোট দেখার নাম করে তাদেরকে পঞ্চায়েতের ওই এলাকায় ডেকে নিয়ে যায় । সন্ধ্যা নাগাদ উজ্জ্বল ও সুশিলের পরিবার জানতে পারে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাবড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ওই দুজনকে নিয়ে আসা হয়েছে ।

কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটনার দিনেই দুজনেরই মৃত্যু হয় । শাসক দলের তরফে দুটি পরিবারকে চাকরির ব্যবস্থা করা হয় । উজ্জ্বল সুরের চাকরি নেয় তার স্ত্রী লিপি সুর, তিনি নবান্নে কর্মরতা । অন্যদিকে সুশীলের চাকরি নেয় তার দিদি মিনতি দাস, তিনি খাদ্য বিভাগে কর্মরতা ।

সুশিলের মা বছর তিরাশির বৃদ্ধা, লক্ষ্মী রানী দাস জানান, উজ্জ্বলকে জখন দুষ্কৃতীরা আক্রমণ করছে তখন সুশীল বাধা দেওয়ায় তার মাথায় বাঁশের বাড়ির দিয়ে পিটিয়ে খুন করা হয় । বৃদ্ধ বয়সে এসে সন্তান হারানোর দুঃখ তিনি যেন কিছুতেই ভুলতে পারছেন না । বর্তমানে সুশীলের মৃত্যুর পর সরকারি চাকরি পাওয়া মেয়ে মিনতিই এখন ভরসা লক্ষী দেবীর । খাওয়া-দাওয়া যাবতীয় কিছু দেখেন তিনি ।

অন্যদিকে উজ্জ্বল সুরের মা বছর সত্তরের মঞ্জু সুর জানান, ছেলের মৃত্যুর পর উজ্জলের স্ত্রী অর্থাৎ তার বৌমা লিপি সুর চাকরি পেয়েছেন । অথচ বৃদ্ধার দিন চলছে কোনক্রমে । সামান্য খাওয়া-দাওয়া বা অর্থ দিয়েও তাকে সাহায্য করেন না তাঁর বৌমা ‌। বাড়ির সামনে একটি প্লাস্টিক টাঙিয়ে সামান্য রুটি-সবজি বিক্রি করেন তিনি । দিনে একশো টাকাও লাভ হয় না তার । মঞ্জু তার প্রতিবন্ধী অবিবাহিত বড় ছেলে গৌতম সুরকে নিয়ে কোনক্রমে দিন কাটাচ্ছেন ।

গৌতম প্রতিবন্ধী হলেও তার প্রতিবন্ধী কার্ড এখনও বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে জোগাড় করতে পারেননি মঞ্জু দেবী । তাই একপ্রকার অসহায় তিনি । মাঝেমধ্যে ছেলের বাঁধানো ছবি বের করে দেখেন; কখনও মুছিয়ে দেন ছেলের ছবিতে পড়া ধুলো । তবু আক্ষেপ, ‘ঘটনার দিন ওই বুথে শুধু পুলিশ না থেকে সেন্ট্রাল বাহিনী যদি থাকতো হয়তো ছেলেকে হারাতে হতো না’ । আবারও পঞ্চায়েত ভোট আসছে ‘আর যেন কোনও মায়ের বুক খালি না হয় । কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে যেন ভোট করানো হয় এমনটাই আর্তি মৃত উজ্জ্বল সুরের মা মঞ্জু সুরের ।

একই দিনে হাবড়া এক নম্বর ব্লকের বেরগুম-২ নম্বর পঞ্চায়েতের কৃষ্ণনগরে ভোট কেন্দ্রের সামনে বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষে গুরুতর জখম হয়েছিল বিপ্লব সরকার নামে পঞ্চায়েত সমিতিতে দাঁড়ানো এক তৃনমূল প্রার্থী । কয়েকদিন কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয় । আবারও একটি পঞ্চায়েত ভোট এসেছে । অভিশপ্ত সেই দিনের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না তো! এই প্রশ্নই এখন যেন ঘুরপাক খাচ্ছে ।

নিউজ টাইম চ্যানেলের খবরটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
Inform others ?
Share On Youtube
Show Buttons
Share On Youtube
Hide Buttons
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
Facebook
YouTube