বুসানা ভেকিয়া: ভুতুড়ে অঞ্চল থেকে পর্যটকদের প্রাণকেন্দ্র

ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল ইতালির লিগুরিয়া অঞ্চলের পাহাড়ি গ্রাম বুসানা ভেকিয়া। পরে সেটা পুনর্নির্মাণ করেছিলেন একদল শিল্পী। ক্রমে পর্যটকদের কাছে একটা জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে ওঠে বুসানা ভেকিয়া। সেই গ্রামেরই বাসিন্দারা এখন উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

ইতালির মধ্যযুগীয় গ্রাম বুসানা ভেকিয়া। সরু রাস্তা একেবারে নিস্তব্ধ। সামনে যে কাচের দরজা রয়েছে, সেখান থেকে ভেসে আসা হলুদ আলোয় ঝলমল করছে রাস্তার পাথরগুলো। সেখানেই থাকেন শিল্পী নিনা ফ্র্যাঙ্কো। তিনি বুসানা ভেকিয়ার নতুন বাসিন্দাদের মধ্যে একজন। আর্জেন্টিনায় ২০ বছর কাটানোর পরে ২০২২ সালে এখানে এসেছেন। যোগ দিয়েছেন গ্রামে বসবাসকারী আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সারগ্রাহী সম্প্রদায়ে। তাঁর মুখেই শোনা গেল এই গ্রামের ইতিহাস। ইতালীয় রিভিয়েরা উপকূলে সুসজ্জিত এবং রিসোর্টে ভরা শহরগুলোর মাঝে বুসানা ভেকিয়া কিন্তু এক অদ্ভুত চরিত্র। ইতালির সানরেমোর উপরে থাকা পাহাড়গুলোর একেবারে মাথায় যেন আটকে আছে এই গ্রাম। যার সুদীর্ঘ ইতিহাসের সর্বশেষ অধ্যায়ের শুরু একটা বিপর্যয় দিয়ে।

সালটা ১৮৮৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। লেন্টের প্রথম দিনের ভোরের ঘটনা। বুসানা ভেকিয়ার অনেক বাসিন্দাই গির্জায় ছিলেন। মাঠে কাজ করার একদিন আগে প্রার্থনা করছিলেন। শোনা যায়, ধর্মযাজক তাঁর শেষ প্যারিশিয়ানের কপালে ভস্ম লাগিয়ে দেওয়ার পরই ভয়ানক এক কম্পন অনুভূত হয়। তার ঠিক পাঁচ মিনিট পর দ্বিতীয় দফায় কম্পন, ভূমিকম্পে গির্জার পুরু পাথরের ছাদ ধসে মাটিতে আছড়ে পড়ে। সেদিন উত্তর লিগুরিয়ান উপকূলে আঘাত হানা ভূমিকম্পে ধ্বংস করে দিয়েছিল গ্রামের উপরের অংশকে। অনেক বাসিন্দারই মৃত্যু হয়েছিল বাড়ির বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায়। কারণ ভূমিকম্পে অনেকের উপরেই ধসে পড়েছিল তাঁদের বাড়ির ছাদ। সরকারি হিসেবে সেদিন মোট ৫৩ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল ওই বিধ্বংসী বিপর্যয়ে। গ্রামে ঢোকার মুখে একটা মার্বেল ফলকে লেখা আছে নিহতদের নাম।

সেপিয়ায় তোলা ছবিতে দেখা যায়, পাহাড়ের নিচ দিয়ে সারি সারি কাঠের ব্যারাক যেখানে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল গৃহহীন বাসিন্দাদের। নিজেদের বাড়ি, যেগুলি সেদিন ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়েছিল, সেগুলি থেকে কয়েক মিটার দূরত্বে তৈরি হওয়া এই অস্থায়ী ব্যারাকই দীর্ঘ সাত বছর ধরে ছিল তাদের স্থায়ী ঠিকানা। বাসস্থান পুনর্নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। অবশেষে বুসানা নুয়োভা নামক পাহাড়ের নীচে নতুন গ্রামের জন্য প্রথম পাথর স্থাপন করা হয়েছিল দুই বছর পর, অর্থাৎ ১৮৯৪ সালে। আর ক্রমে পরিত্যক্ত হয়েছিল আসল গ্রাম যা ভুমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এরপর কেটে গিয়েছিল বেশ কয়েক বছর। ভুতুড়ে অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল বুসানা ভেকিয়া বা ওল্ড বুসানা। চোরাচালানকারীরা ফ্রান্সে প্রবেশের আগে নিষিদ্ধ দ্রব্য সংরক্ষণের জন্য এই পরিত্যক্ত গ্রামটিকে ব্যবহার করেছিল এবং দক্ষিণ ইতালি থেকে অভিবাসীরা কিছু সময়ের জন্য সেখানে চলে এসেছিল। প্রতিবারই এই সব বাসিন্দাকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জোর করে উচ্ছেদ করে বলে অভিযোগ।

ছবিটা বদলায় ১৯৫০ এর দশকের শেষের দিকে। মারিও জিয়ানি (যিনি ক্লিজিয়া নামে পরিচিত) নামে তুরিনের একজন সেরামিক আর্টিস্ট এই গ্রামকে শিল্পী সম্প্রদায়ের আস্তানায় পরিণত করার কথা ভাবেন। আস্তে আস্তে ইউরোপের বিভিন্ন অংশের শিল্পীরা তাঁকে অনুসরণ করেন। তাঁদের আকৃষ্ট করেছিল এমন একটা জায়গা যেখানে কোনও নিয়ম নেই। আশপাশের ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া জিনিস দিয়ে নিজের বাড়ি নিজেরাই তৈরি করেন। আর দিন কাটানো যায় শিল্পকর্ম করেই, এরকম ভাবনা থেকেই শুরু হয় যাত্রা। এই এলাকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা এরমিনিয়া পাসকুচি। ১৯৭৪ সালে ২২ বছর বয়সে প্রথমবার বুসানা ভেকিয়ায় এসেছিলেন তিনি। প্রথম অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গে স্মৃতিমধুর হয়ে তিনি বলেন, সেদিনের সুঘ্রাণ তাঁর এখনও মনে আছে। তাঁর কথায়, ‘আমাদের দুটো কুয়ো ছিল যেখান থেকে জল পেতাম আমরা। তবে সেই জল শুধুমাত্র জিনিসপত্র পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহার করা যেত। কাছাকাছি অবস্থিত শহর আরমা দি তাজ্জ্যাতে সপ্তাহে একবার যেতে হতো স্নান করার জন্য’. তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তেলের প্রদীপ ও মোমবাতি ব্যবহার করতাম। হয়তো জায়গাটার প্রতি আমাদের যে মুগ্ধতা ছিল, তারই একটা অংশ ছিল – জীবনের সঙ্গে অপরিহার্য্য জিনিসের যোগকে আবার নতুন করে খুঁজে পাওয়া’। বাড়ির সাদা রঙ করা দেয়ালগুলোর দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, ‘এই পাথরের প্রেমে পড়তে আপনি বাধ্য’।

ভূমিকম্পের ক্ষত কিন্তু বুসানা ভেকিয়া আজও বহন করে। মধ্যযুগীয় আদলে এই বাড়িগুলোর কোনওটা সেদিন বিস্কুটের মতো ভেঙে পড়েছিল। আবার কোনওটাতে সদ্য লাগানো ফুলের টব আর জানালায় রঙিন পর্দা জানান দিয়েছে নতুন প্রাণের সঞ্চার। পাশের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড় করানো রয়েছে বাচ্চাদের সাইকেল।

এই গ্রামে সব সময়ে উৎসবের মেজাজ থাকে। সর্বত্র শিল্পীদের ছাপ রয়েছে- দেওয়াল জুড়ে রঙিন টালির টুকরো, চিত্রকর্মে সাজানো রাস্তা, সাজানো, পেঁচানো তার, কাদামাটি বা কুড়িয়ে পাওয়া উপকরণ দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যগুলো ইস্টার আগের মতো বাসনার আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে. ছাদহীন গির্জাটা এখনও সেভাবেই রয়েছে। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত সেই গির্জা এখন ঘাস আর আগাছায় ভরা। গির্জার ‘ফ্রেস্কো’ যুক্ত খিলানে এখন পায়রার বাস।

সেই উত্তেজনায় ভরপুর ‘হিপ্পি’ দিনকাল আর নেই। একদা পরিত্যক্ত গ্রামে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও আর ধরা ছোঁয়ার বাইরে নেই। এখন বিদ্যুৎ, জলের ব্যবস্থা রয়েছে. ‘এয়ারবিএনবিও আছে। বেশ কয়েকটা রেস্তোঁরা আছে. স্থানীয় পানশালাও রয়েছে। যা সপ্তাহান্তে ফরাসি এবং জার্মান পর্যটকদের ‘স্প্রিটজ’ পরিবেশন করে দ্রুত এবং লাভজনক ব্যবসা করছে। আজকাল শিল্পীদের অনেকেই তাঁদের শিল্পকর্মের পাশাপাশি ফ্রিজের জন্য তৈরি চুম্বক বিক্রি করেছে। সৈকত রিসর্ট এবং নিকটবর্তী সানরেমোর পাশাপাশি বুসানা ভেকিয়াও এখন কিন্তু আকর্ষণের আরেক বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এর কারণ বুসানা ভেকিয়ার সঙ্গীত উৎসব এবং ক্যাসিনো। অথচ বুসানা ভেকিয়ার এত জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও কিংবা হয়তো সেই কারণেই স্থানীয় প্রশাসন এখানকার বাসিন্দাদের উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে।

২০১৭ সালে বাসিন্দারা যে চিঠি পেয়েছিলেন তাতে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছিল যে ওই বাড়িগুলোতে থাকার কোনও আইনি অধিকার তাঁদের নেই। জানানো হয়েছিল, রাষ্ট্র তাদের অবৈধ দখলদার হিসাবে চিহ্নিত করেছে। এর উত্তরে গ্রামের লোকেরা একজোট হয়ে একটা গোষ্ঠী তৈরি করে, নিজেদের ‘আই রেসিলিয়েন্টি’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। এই যৌথ গোষ্ঠীর সঙ্গে আপাতত আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ এবং ইতালিয়ান স্টেট প্রপার্টি ডিপার্টমেন্ট-এর টানাপোড়েনে রয়েছে. যে বাড়ি বাসিন্দারা নিজেরা পুনর্নির্মাণ করেছেন, তার মালিক হিসাবে স্বীকৃতি চান তাঁরা। প্রাথমিকভাবে প্রশাসন চেয়েছিল অবৈধভাবে বাড়িগুলো দখল করার জন্য রাষ্ট্রকে জরিমানা দিক বাসিন্দারা। কিন্তু ২০২৪ সালের জুন মাসে স্টেট কাউন্সিলের একটা রায়ে তা বাতিল করা হয়েছে।

সানরেমো পৌরসভা এই অচলাবস্থা সমাধানের জন্য বিভিন্ন উপায়ের বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে সর্বজনীন নিলাম। যাতে গ্রামবাসীরা তাঁদের নিজেদের বাড়ি ‘বিড’ করতে পারেন। ‘পুরোটাই পরস্পর বিরোধী। একদিকে পৌরসভা বলছে – বুসানা ভেকিয়া, শিল্পীদের সুন্দর গ্রাম পরিদর্শন করুন! আবার একই সঙ্গে তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে।’, বলেন এরমিনিয়া পাসুচি। আঞ্চলিক মেয়র আন্দ্রেয়া জাম্মাতোরো জানিয়েছেন, পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাগুলো ‘এমন সুন্দর সুযোগ যা হারানো যাবে না’। এর মাধ্যমে এই গ্রামকে একটা “রত্ন” তে পরিণত করা যায়। একই সঙ্গে ‘নিশ্চিত করা যায় যে জায়গাটা যেন নিরাপত্তায় বেষ্টিত অবস্থাতেও থাকে’। বুসানা ভেকিয়াতে বেড়ে উঠেছেন আন্দ্রেয়া জাম্মাতোরো। তিনি বলেন, এই গ্রাম যে নিরাপদ নয়, এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। ‘সম্ভবত এই গ্রামে সবচেয়ে খারাপ দুর্ঘটনা ঘটেছে আমার সঙ্গে’, তাঁর মন্তব্য।

‘আমার বয়স তখন আট বছর। ভেঙে পড়া গির্জায় খেলছিলাম। সেই সময় একটা পাথর উপর থেকে আমার মুখে এসে পড়ে। আমার নাক ভেঙে গিয়েছিল। একমাত্র এই একটা কারণ নিয়ে রাষ্ট্র এখন উদ্বিগ্ন। সেটা হল, কোনও পর্যটক এখানে ঘুরতে এসে আহত হলে, তার ক্ষতিপূরণ হিসাবে হাজার হাজার ইউরো ব্যয় করতে হবে সরকারকে। যেটা তারা একদমই চায় না’, মন্তব্য আন্দ্রেয়া জাম্মাতোরোর।

অন্যান্য অনেক বাসিন্দার মতো তিনিও চিন্তিত যে একবার যদি গ্রামের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যায়, তাহলে এই গ্রাম পর্যটকে ভরে যাবে এবং তার ‘বোহেমিয়ান’ প্রকৃতি হারিয়ে ফেলবে। সিদ্ধান্তের বিষয়ে গ্রামবাসীরা কিন্তু বিভক্ত। কেউ কেউ সম্পত্তির অধিকার পেতে চান। কেউ আবার আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষকে দেওয়া প্রতীকী বার্ষিক ভাড়ার বিনিময়ে তাদের বাড়িতে তাদের বাকি জীবন কাটানোর অধিকার পেতে চান। কয়েক বছর ধরে এই নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। তবে সমষ্টিগত ভাবে বাসিন্দারা ভয় পাচ্ছেন যে, রাষ্ট্র প্রতিটি বাসিন্দাকে উচ্ছেদের জন্য আদালতে টেনে নিয়ে যাবে. তারপর হয়ত তাদের একে একে উৎখাত করবে।

দুই পক্ষের মধ্যে এই বিরোধের কারণে, ইউরোপীয় পুনরুদ্ধার তহবিলের ১৫০ লক্ষ ইউরো, যা গ্রামের পুনর্নির্মাণের জন্য ব্যবহার করা যেত তা চলে গিয়েছে সানরেমোতে। অবশ্য এই নিয়ে বাসিন্দারা কিছু মনে করেছেন, তেমনটা কিন্তু নয়। তাঁরা আবর্জনায় ঘেরা গ্রামের ভাঙাচোরা অবস্থায় অভ্যস্ত। বাড়ির বাইরে তারের জট নিয়ে ভাবেন না তারা। ফুটো হওয়া ছাদ তারা নিজেরাই জোড়াতালি দিয়ে সারিয়ে ফেলেন। আসলে তাঁরা যেটা রক্ষা করার চেষ্টা করছেন, সেটা কোনও পার্থিব বস্তু নয়। তারা বাঁচাতে চাইছেন মুক্তমনা এবং স্বাধীনতার চেতনার সেই অনুভূতি যা গত ৬০ বছর ধরে বুসানা ভেকিয়াকে স্বকীয় করে তুলেছে।

নিউজ টাইম চ্যানেলের খবরটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
Inform others ?
Share On Youtube
Show Buttons
Share On Youtube
Hide Buttons
Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial
Facebook
YouTube