লিপ-ইয়ারের গোড়ার কথা

নিউজটাইম ওয়েবডেস্ক : কৃষকরা তাদের ফসল উৎপাদনের নির্দিষ্ট সময় নির্ণয় করার জন্য ক্যালেন্ডারের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভব করতো। রোমানরাই পৃথিবীতে প্রথম ক্যালেন্ডার তৈরির দাবিদার। পণ্ডিত পণ্ডিফোরাই ৭৫৬ অব্দে এটি আবিষ্কার করেন। চাষাবাদের ওপর ভিত্তি করে এ ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করা হয় বলে এর মাসের সংখ্যা ছিল ১০। প্রবল শীতে ইউরোপে চাষাবাদ বন্ধ থাকতো বলে শীতের এই দু’মাস এতে ছিল না। শুক্লপক্ষের প্রথম চাঁদ দেখা দিলেই মাস গণনা শুরু হতো। এর নাম দেয়া হয় ‘ক্যালেন্দি’। আর ক্যালেন্ডার শব্দটির আবির্ভাব হয় এই ‘ক্যালেন্দি’ শব্দ থেকেই। ১০ মাসের ক্যালেন্ডারে দিনের সংখ্যা ছিল। ৩০৪। রোমান রাজা নুমপামপিলিয়াস ৭১৩ অব্দে ওই ক্যালেন্ডারে জুড়ে দেন বাকি দুটো মাস। এভাবেই পাওয়া গেল ১২ মাসে এক বছর। তবে বছর গণনা শুরু হতো যেদিন রাত ও দিন সমান অর্থাৎ বর্তমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মার্চের ২৫ তারিখ থেকে। (বর্তমান হিসাব অনুযায়ী দিনরাত সমান হয় ২১ মার্চ ও ২৩ সেপ্টেম্বর)। ৪৫১ অব্দে রোমের শাসনভার পরিচালিত হতো ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেটের একটি পরিষদ যা ‘দিসেসভিরস’ নামে পরিচিত ছিল। তবে নতুন বছরে নতুন ক্যালেন্ডার প্রচলনের শুরু করেন রোমানরা। প্রথম রোমান রাজা রোমিউলাসের শাসনকালে  রোমান ক্যালেন্ডারের প্রচলন ঘটে।  মার্চ থেকে বছর শুরু হওয়া এ ক্যালেন্ডারে ছিলো ১০ মাস (৩০৪ দিন)। বাদ পড়ে গিয়েছিলো শীতকাল। পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সালে রাজা নুমা পম্পিলিয়াস জানুয়ারি, মার্সিডানাস আর ফেব্রুয়ারি মাস যোগ করে ৩৫৪-৩৫৫ দিনে নিয়ে যান রোমান ক্যালেন্ডারকে। এরপর থেকে জানুয়ারি ও মার্চ মাসের প্রথম দিন- অর্থাৎ বছরে দু’দিন নববর্ষ হিসেবে উদযাপিত হতো। তবে চাঁদের গতিবিধির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় এ ক্যালেন্ডার ঋতুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো না। অনেকসময় নানা প্রভাবশালী মানুষরা নিজেদের সুবিধামতো দিন-মাস যোগ করতেন।

যিশুর জন্মের আগে অবধি রোমানরা ৩৫৫ দিনে বছর পালন করত। ফলে প্রতি বছর রোমান ক্যালেন্ডার পিছিয়ে যেত দশ দিন করে। সেটাকে শুধরাতে প্রায়ই বছরে লিপ মান্থ বা অতিরিক্ত মাস যোগ করতে হত। এই যোগের দায়িত্বে ছিলেন রোমান পুরোহিতরা। নিজেদের খেয়াল খুশি মত এই অতিরিক্ত মাস তাঁরা যোগ করতেন। কোন সেনেটর তাঁদের অপছন্দের হলে তাঁর কার্যকালে একটাও অতিরিক্ত মাস যোগ হত না, আবার কেউ তাঁদের প্রিয় হলে হয়তো বছরে যোগ হয়ে যেত ছয় ছয়টা মাস। এক কথায় ক্যালেন্ডার ব্যাপারটাই একেবারে খিচুড়ি পাকিয়ে গেছিল। বিপদটা এতটাই বাড়ল, যে সেই ক্যালেন্ডার মেনে গরমকাল শুরু হত বসন্তের মাঝামাঝি কিংবা যখন ফসল কাটার উৎসবের কথা হচ্ছে, তখন মাঠে ফসল পাকেই নি, এমনি সব। যিশুর জন্মের ৪৬ বছর আগে রাজা জুলিয়াস সিজার দেখলেন অনেক হয়েছে। এবার এই ব্যাপারটা নিজে না দেখলে বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই বছরই তি সসিজেনিস নামের আলেক্সান্ড্রিয়ার একজন জ্যোতির্বিদের অধীনে বিভিন্ন পণ্ডিতদের নিয়ে এক কমিশন গঠন করলেন, যাদের কাজ হবে নতুন ভাবে ক্যালেন্ডার তৈরি। সসিজেনিস প্রাচীন মিশরীয়দের হিসাব ব্যবহার করেছিলেন। ফলে নতুন ক্যালেন্ডারে সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর আবর্তনকাল ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা নির্ধারণ করেন তিনি। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ফেব্রুয়ারি মাসকে ২৮ দিন রেখে মার্চ, মে, অক্টোবর ও কুইন্টিলিস মাস ৩১ দিনে এবং জানুয়ারি ও সেক্সটিনিস মাসের সঙ্গে দু’দিন যুক্ত করে ৩১ দিন করে গণনা করা হয়। আমরা হিসাব করি ৩৬৫ দিনে এক বছর অর্থাৎ পৃথিবী সূর্যের চার দিকে একবার ঘুরে আসে ৩৬৫ দিনে। কিন্তু বছরের প্রকৃত দৈর্ঘ্য হলো ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড, অর্থাৎ পৃথিবীর এই সময়টুকু লাগে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে। তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রতি বছর আমরা ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড সময় পিছিয়ে যাচ্ছি হিসেবে না ধরার দরুন। ফলে চার বছর পরে এই বাদ যাওয়া সময়টুকু প্রায় ২৪ ঘণ্টায় পরিণত হয় আর সেই ২৪ ঘণ্টাকে মেলানোর জন্যই লিপইয়ারের আবিষ্কার।

কোন বছর লিপ ইয়ার হলে কোন দিনের সঙ্গে একটা দিন অতিরিক্ত যোগ করা হয়? উঁহু, ভুল বললে, ২৮ ফেব্রুয়ারি না, ২৪ ফেব্রুয়ারি। কেমন করে? বছরের ৭টি মাস হত ৩০ দিনে আর বাকি ৫টি মাস হত ৩১ দিনে। রোমানদের ফটকের দেবতা জানুস।  যেহেতু ফটকের দেবতার নামানুসারে জানুয়ারি মাসের নাম, তাই জানুয়ারি মাসকেই নতুন বছরের ফটক বা দরজা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। তখন থেকেই জানুয়ারি মাসকে করা হয় বছরের প্রথম মাস আর ১ জানুয়ারি নববর্ষ উদযাপন করা শুরু হয়। এদিকে  জুলিয়াস সিজার তৎকালীন পঞ্চম মাস কুইন্টালিসকে নিজের নামানুসারে জুলিয়াস নাম দেন, সেইটাই আজকের সপ্তম মাস জুলাই। অর্থাৎ জুলিয়াস সিজার তখনকার প্রচলিত মাসের ক্রম পরিবর্তন করে তৎকালীন একাদশ মাস জানুয়ারিয়াস থেকে বছর গণনা শুরু করে। পরবর্তী রোমান সম্রাট অগাস্টাস পূর্ববর্তী ষষ্ঠ মাস সেক্সটিলিস এর নাম পাল্টে রাখেন অগাস্ট। দুই রোমান সম্রাটই নিজেদের নামের মাস দুটিকে ৩১ দিন করে বরাদ্দ দেন। ফেব্রুয়ারির ৩০ দিনকে সম্মান ৫ ভাগে ভাগ করলে ৩০ ফেব্রুয়ারির আগের ভাগে শেষ দিন ছিল ২৪ তারিখ। এই ২৪ ফেব্রুয়ারির সঙ্গে গোটা একটা দিন যোগ করার ফলে ক্যালেন্ডারটাই এগিয়ে যায় এক ধাপ।  ফেব্রুয়ারি হয়ে যায় ২৯ দিনের। তবে এখনও ফ্রান্সে লিপ ইয়ারের এই অতিরিক্ত দিনকে বিস সেক্সটাম-ই বলে। আরও কিছু প্রমাণ দেওয়া যায় এর পক্ষে। ডেনমার্কে প্রতি লিপ ইয়ারের ২৪ ফেব্রুয়ারি মেয়েরা পছন্দের ছেলেদের ভালবাসা জানাতে পারে। ১৯৭০ অবধি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সেন্ট ম্যাথিয়াসের উৎসব লিপ ইয়ারে ২৪ এর বদলে ২৫ ফেব্রুয়ারিই হতো।মনে হতে পারে এ আবার কি অদ্ভুত নিয়ম! মাসের মাঝে দিন যোগ করা! কিন্তু সেই বেচারা রোমানদের কথা ভাব তো! খৃস্টপূর্ব ৪৬ সালে এই ক্যালেন্ডারের হিসেব মেলাতে সেই বছরটা ছিল মোট ৪৪৫ দিনের। সিজার নিজে সেই বছরকে বিশৃঙ্খলার শেষ বছর বলেছিলেন। এই পরিষদই প্রথম মার্চের পরিবর্তে জানুয়ারি থেকে বছর গণনা শুরু করার নির্দেশ দেন। এই পদ্ধতি চালু হতে সময় লাগলেও পৃথিবীর সবদেশেই এই পদ্ধতি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। জুলিয়াস সিজারের নামানুসারে এই ক্যালেন্ডারের নামকরণ হয় জুলিয়ান ক্যালেন্ডার।

Inform others ?
Show Buttons
Hide Buttons